কাজের ধারা গত দশ বছরে আমূল বদলে গিয়েছে। কারখানার ঘণ্টাধ্বনি, কড়া হায়ারার্কি আর “চেয়ারে বসে থাকার সময়”, এগুলো আর আধুনিক কর্মসংস্কৃতির মাপকাঠি নয়। এখন কর্মীরা চাকরিকে শুধু আয়ের উৎস হিসেবে দেখছেন না; তারা চাইছেন সম্মান, সহযোগিতা, এবং উন্নতির সুযোগ। এই পরিবর্তনের মূল চালক হচ্ছে জেন জি প্রজন্ম।
আজকের কর্মক্ষেত্রে ড্রেস কোড ঢিলেঢালা, আছে খেলা-ধুলা, দলীয় কার্যক্রম, আর টিম বিল্ডিং প্রোগ্রাম, সবই জেন জি-এর দাবি প্রতিফলিত করছে। স্টার্টআপ থেকে বড় কোম্পানি, সকলেই নিজেদের এই নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হিউম্যান রিসোর্স নীতিমালা বদলাচ্ছে।
এখন অধিকাংশ বোর্ডরুমে নিয়োগ নয়, কর্মী টিকিয়ে রাখা হচ্ছে আলোচনার মূল বিষয়। কত বেতন দেওয়া হবে তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হল, কীভাবে কর্মীদের সম্পৃক্ত রাখা যায়। ম্যাভেরিক সিস্টেমস-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিউম্যান রিসোর্সেস কৃষ্ণকুমার রামচন্দ্রন বলেন, “আজকের কর্মীরা শুধু বেতন চান না, তাঁরা সম্মান, স্বাধীনতা আর সারাজীবন শেখার সুযোগকে প্রতিদিনের কাজের অংশ হিসেবে চান।”
এর ফলেই কোম্পানিগুলো নীতি বদলাচ্ছে, ঘন ঘন ফিডব্যাক সেশন, ফ্লেক্সিবল আওয়ার্স, পিয়ার লার্নিং সার্কেল আর মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম এখন মূলধারায় চলে এসেছে। আগে ওয়ার্ক কালচারকে সহজ মূল্যবোধ মনে করা হত, এখন সেটাকে সরাসরি উৎপাদনশীলতার চালিকাশক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রামচন্দ্রন বলেন,”একটি ফ্ল্যাট অর্গ স্ট্রাকচার কর্মীদের দৃশ্যমানতা বাড়ায়, স্বীকৃতি দেয় এবং উদ্ভাবনের ক্ষমতা জোগায়।” বেঙ্গালুরুর একটি টেক স্টার্টআপে কর্মরত ২৪ বছর বয়সি প্রিয়াঙ্কা, তিনি বলেন, “অফিসটা মগজের জন্য প্রেশার কুকার হওয়া উচিত নয়। বরং সেখানে শেখা, একসাথে কাজ করা আর আনন্দ পাওয়ার সুযোগ থাকতে হবে। তাই ফ্লেক্সিবল আওয়ার্স, রিল্যাক্স করার জায়গা কিংবা গেম জোন আমাদের মনোযোগী আর সৃজনশীল থাকতে সাহায্য করে।”
তবে এই পরিবর্তন সর্বত্র একরকম নয়। একদিকে স্টার্টআপগুলোতে আছে খোলা অফিস, অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি আর ক্রস-ফাংশনাল টিম; অন্যদিকে অনেক পুরনো কোম্পানি এখনো উপস্থিতি-ভিত্তিক পুরস্কার, কড়া সময়সূচি আর হায়ারার্কি মেনে চলছে। রামচন্দ্রন একে বলেন “পকেটেড ইভোলিউশন”।
কিছু ইতিবাচক দিকও আছে, টিম লিডাররা কর্মীদের কথা বেশি শুনছেন, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা বাড়ছে, মহিলারা সম্মানের সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে ফিরছেন। কিন্তু এখনও বৈষম্য, ভয় আর নীরবতা রয়ে গেছে। তিনি বলেন, “কোনও নীতি গাইডে যা লেখা আছে তা নয়, প্রতিদিন কর্মীরা কেমন অনুভব করছেন সেটাই আসল সংস্কৃতি।”
স্টার্টআপগুলোই এখন নতুন কাজের ধরন পরীক্ষার ল্যাবরেটরি। এখানে ইক্যুইটি-ভিত্তিক ইনসেনটিভ, নো-ডিজাইনেশন মডেল, ফ্লেক্সিবল লিভ সিস্টেম চালু হচ্ছে। এগুলো কর্মীদের স্বাধীনতা আর উদ্ভাবন বাড়ালেও সমস্যাও আছে, বার্নআউট বেড়েছে, আর কাঠামোর অভাবে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। তাই বড় কোম্পানির জন্য বার্তা হল, স্টার্টআপের দ্রুততার নীতি নিতে হবে, তবে টেকসই কাঠামোর সঙ্গে মিলিয়ে।
ভালো কর্মক্ষেত্র কাউকে আনুগত্য করতে বলে না; প্রতিদিন নিরাপত্তা আর মর্যাদা দিয়ে তা গড়ে তোলে। মানসিকভাবে নিরাপদ টিমগুলো বেশি ভালো করে, কারণ তারা বিশ্বাসের ওপর কাজ করে।
মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে কর্মজীবনে ফেরা নারী, নতুনরা যাঁরা শিখতে চায়, কিংবা অভিজ্ঞ যারা ফ্লেক্সিবিলিটি চান, সবাই মর্যাদা পেলে ভালো কাজ করেন।
বর্তমানে কর্মীরা শুধু বেশি বেতনের জন্য নয়, সহানুভূতির অভাবে চাকরি ছাড়ছেন। রামচন্দ্রন স্পষ্ট করে বলেন, “বার্নআউট কঠোর পরিশ্রম থেকে হয় না; বরং হয় তখনই যখন কঠোর পরিশ্রম সত্ত্বেও কেউ নিজের কাজের মর্যাদা পান না”। জেন জি প্রজন্ম কর্মক্ষেত্রে খোলামেলা পরিবেশ চায়। তারা শুধু লেখা নয়, মূল্যবোধের বাস্তব প্রয়োগ দেখতে চায়। সংস্কৃতি কোনো স্থায়ী জিনিস নয়, কর্মীদের প্রয়োজন অনুযায়ী তা বদলাতে হবে।
কাজের নিয়ম বদলানো এখন আর বিকল্প নয়, বরং প্রয়োজন। যে প্রতিষ্ঠান তা করবে না, তারা প্রতিভা আর প্রাসঙ্গিকতা দুই-ই হারাবে। স্টার্টআপগুলো দেখিয়েছে ফ্লেক্সিবিলিটি আর উদ্দেশ্য কী করতে পারে, তবে অতিরিক্ততার বিপদও প্রকাশ করেছে। সমাধান হল, একইসাথে দ্রুততা আর যত্নশীলতা, চাহিদা আর মর্যাদা দুটোকেই সমন্বয় করা।
কর্মক্ষেত্রের সংস্কৃতি এখন শুধু বাড়তি মূল্য নয়; এটাই আসল কাজ। যে প্রতিষ্ঠান তা দ্রুত বুঝবে, তারাই ভবিষ্যতে টিকে থাকবে আর সফল হবে।

