
ইথিওপিয়ার হাইলি গুবি শুধুমাত্র একটি আগ্নেয়গিরি নয় এটি আফ্রিকার রিফট ভ্যালির গভীর ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস বহনকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ আগ্নেয় বলয়। উত্তর-পূর্ব ইথিওপিয়ার আফার অঞ্চলে অবস্থিত এই আগ্নেয়গিরিটি হাজার বছর ধরে সম্পূর্ণ নীরব ছিল। ভূতত্ত্ববিদদের ধারণা, প্রায় ১২ হাজার বছর আগে শেষ অগ্নুৎপাতের পর এটি কার্যত সুপ্ত অবস্থায় ছিল। সেই সুপ্ত দৈত্যই হঠাৎ করে আবার জেগে ওঠায় আন্তর্জাতিক নজর এখন ইথিওপিয়ার দিকে।
হাইলি গুবি আসলে কেমন আগ্নেয়গিরি?
ইথিওপিয়ার এই অঞ্চলটি পৃথিবীর সবচেয়ে ভূ-সক্রিয় অঞ্চলের একটি অফার ট্রাইপয়েন্ট। এখানে আফ্রিকান, অ্যারাবিয়ান এবং সোমালি টেকটোনিক প্লেট তিন দিক থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছে। ফলে ভূত্বকের গভীরে থাকা ম্যাগমা প্রায়ই উপর ওঠার পথ পায়। হাইলি গুবি এই বিস্তৃত আগ্নেয় বলয়েরই একটি অংশ।
এটি মূলত বেসাল্টিক শিলার ওপর গঠিত এবং এর ভেতরে রয়েছে বহু ছিদ্রযুক্ত চ্যানেল, যেখান দিয়ে গ্যাস ও গরম বাষ্প বের হতে পারে। তবে এই আগ্নেয়গিরির বিশেষত্ব হলো এটি কখনোই নিয়মিত লাভার স্রোত ছাড়ে না। বরং এর বিস্ফোরণ সাধারণত গ্যাস-চাপ সৃষ্ট এক্সপ্লোসিভ ইরাপশন, যেখানে ছাই, সূক্ষ্ম শিলা-চূর্ণ, কাচের টুকরোর মতো হালকা উপাদান বিশাল প্লুম আকারে উপরে উঠতে পারে।
কেন ১২ হাজার বছর পরে এই অগ্নুৎপাত?
সুপ্ত আগ্নেয়গিরির ক্ষেত্রে চাপে থাকা ম্যাগমা-চেম্বার দীর্ঘ সময় পরে গ্যাসে পূর্ণ হয়ে বিস্ফোরণের পরিস্থিতি তৈরি করে। ভূস্তর ফেটে গেলে এই জমে থাকা গ্যাস একধাক্কায় বেরিয়ে এসে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। এবারের বিস্ফোরণেও ঠিক সেটাই ঘটেছে লাভা প্রবাহিত হয়নি, শুধু গ্যাস ও ছাই আকাশচুম্বী ধোঁয়ার স্তম্ভ তৈরি করেছে।
ভূতাত্ত্বিক গুরুত্ব কেন এত বেশি?
হাইলি গুবি আফ্রিকা মহাদেশের ভবিষ্যৎ ভাঙনের এক জীবন্ত উদাহরণ। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, কয়েক মিলিয়ন বছর পরে এখান থেকেই একটি নতুন মহাসাগর সৃষ্টি হতে পারে। তাই এই অঞ্চলে ঘটে যাওয়া প্রতিটি আগ্নেয় কর্মকাণ্ড পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের সংকেত বহন করে। এই বিস্ফোরণ ভূত্বকের গভীর চাপ-বিন্যাস ও গ্যাস-সংগঠনের নতুন ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ইথিওপিয়ার আগ্নেয় বলয়ে এর অবস্থান
হাইলি গুবির কাছেই রয়েছে আরেকাধিক আগ্নেয়গিরি এরটা আলে, দালোলো, নাব্রো। এগুলো পৃথিবীর সবচেয়ে সক্রিয় আগ্নেয় অঞ্চলের অংশ। এই এলাকায় ভূমিকম্পও খুব সাধারণ ঘটনা। ফলে বিজ্ঞানীরা এখানে স্থায়ী মনিটরিং সিস্টেম রেখেছেন, যাতে কোনও অগ্নুৎপাত বা ভূমিকম্পের ঝুঁকি আগেভাগে চিহ্নিত করা যায়।
কেন এই অগ্নুৎপাত বিশ্বজুড়ে আলোচনায়?
- অতি বিরল, ১২ হাজার বছর পর প্রথম বিস্ফোরণ
- বিস্ফোরণধর্মী উচ্চস্তরে ছাই পৌঁছেছে ১৫–৪০ কিমি পর্যন্ত
- বিমান চলাচলে প্রভাব ভারতসহ বিভিন্ন দেশের উড়ানপথ বদলাতে হয়েছে
- আফার রিফটের ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের নতুন ইঙ্গিত
হাইলি গুবির সাম্প্রতিক অগ্নুৎপাত শুধু ইথিওপিয়ার নয়; পৃথিবীর টেকটোনিক ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রেও এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন এই ধরনের বিস্ফোরণ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীর ভেতরের আগুন কখনোই পুরোপুরি নিভে নেই।

