
বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এক অভূতপূর্ব এবং বিস্ফোরক ‘দ্বৈত শাসনের’ দোলাচলে দোদুল্যমান। একদিকে ঢাকা থেকে রাষ্ট্র সংস্কারের ঝাণ্ডা ধরা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, অন্যদিকে দিল্লি থেকে ক্রমাগত রাজনৈতিক মোখিক গোলাবর্ষণ করতে থাকা ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই দুই মেরুর বাদানুবাদ কেবল ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে এক গভীর অনিশ্চয়তার গহ্বরে ঠেলে দিয়েছে।
ভারত থেকে শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক বিবৃতিগুলো কেবল ধারালো নয়, বরং সরাসরি দিল্লির নিরাপত্তা উদ্বেগকে হাতিয়ার করার এক সুপরিকল্পিত কৌশল। তিনি অত্যন্ত চতুরতার সাথে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং ‘চিকেনস নেক’ (শিলিগুড়ি করিডোর)-এর বিপন্নতার কথা তুলে ধরেছেন। তার বার্তা স্পষ্ট—ইউনূস প্রশাসন মানেই ‘চরমপন্থী ও নৈরাজ্যবাদীদের’ অভয়ারণ্য। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং সংবাদপত্রের ওপর হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে তিনি আন্তর্জাতিক মহলে ড. ইউনূসের ‘শান্তি ও গণতন্ত্রের’ ভাবমূর্তিকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে চাইছেন।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর হলো তার প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত কড়া হুঁশিয়ারি। জুলাই আন্দোলনের দমনে ‘মানবতা-বিরোধী’ অপরাধে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও হাসিনা সেই রায়কে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন। ঢাকাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে তিনি একে ‘ক্যাঙারু ট্রাইবুনাল’ বলে অভিহিত করেছেন। তার সাফ কথা—রাজনৈতিকভাবে খুন করার জন্য তাকে ফেরত চাওয়া হচ্ছে। ‘একমাত্র বৈধ সরকার এবং স্বাধীন বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলেই আমি ফিরব’—এই দম্ভোক্তির মাধ্যমে তিনি কার্যত বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বৈধতাকেই সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন।
অন্যদিকে, ড. ইউনূস অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ভারতকে বার্তা দিয়েছেন যে, আশ্রিত হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ‘অবন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ’। ভারতের মাটিতে বসে হাসিনার এই নির্দেশনা ও মন্তব্য বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি বজায় রাখার পথে সবচেয়ে বড় বাধা। ইউনূস ভারতকে এক কঠিন কূটনৈতিক সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন—ভারত কি একজন বন্ধুপ্রতিম প্রাক্তন নেত্রীকে আশ্রয় দিয়ে বর্তমান বাংলাদেশের জনগণের সাথে শত্রুতা করবে? তিনি ভারতকে ‘আওয়ামী লীগ-কেন্দ্রিক’ চশমা খুলে বাস্তবতাকে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, শেখ হাসিনা ছাড়া বাংলাদেশ আফগানিস্তান হয়ে যাবে—দিল্লির এই ন্যারেটিভ আদতে প্রতিবেশী সম্পর্কের অন্তরায়।
এই পুরো পরিস্থিতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ভারতের অস্বস্তিকর অবস্থান শ্যাম রাখি না কুল রাখি অবস্থা।দিল্লি এখন এক কঠিন উভয়সংকটে। একদিকে দীর্ঘদিনের বন্ধু শেখ হাসিনাকে তারা ছুঁড়ে ফেলতে পারছে না, অন্যদিকে বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতাকে অস্বীকার করলে তাদের নিজেদের সীমান্ত সুরক্ষা ও ট্রানজিট সুবিধা হুমকির মুখে পড়বে।
ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের প্রাক্কালে হাসিনার এই ‘আক্রমণাত্মক মেজাজ’ এবং ইউনূস প্রশাসনের ‘প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান’ বাংলাদেশের রাজনীতিকে এক আগ্নেয়গিরির মুখে দাঁড় করিয়েছে। হাসিনাকে প্রত্যর্পণ না করা পর্যন্ত ঢাকার ক্ষোভ কমবে না, আর দিল্লি যদি হাসিনাকে রাজনৈতিক বক্তব্য থেকে বিরত না রাখে, তবে দুই দেশের সম্পর্কে ফাটল আরও চওড়া হবে। কূটনীতি যখন বাকযুদ্ধে পর্যবসিত হয়, তখন স্থিতিশীলতা হয়ে পড়ে সুদূর পরাহত। এই মুহূর্তে দক্ষিণ এশিয়ার আকাশে যে কালো মেঘ জমেছে, তার বজ্রপাত কোথায় হয়—তা-ই এখন দেখার বিষয়।।
