
সামাজিক মেলামেশা বা পেশাগত জীবনে মুখ থেকে নির্গত দুর্গন্ধ বা ‘হ্যালিটোসিস’ (Halitosis) একজন মানুষের আত্মবিশ্বাসে বড়সড় ফাটল ধরাতে পারে। অনেক সময় আমরা বিষয়টিকে কেবল দাঁতের পরিচ্ছন্নতার অভাব বলে মনে করি। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য বলছে, নিয়মিত ব্রাশ করার পরেও যদি দুর্গন্ধ না কমে, তবে তা শরীরের গভীরে লুকিয়ে থাকা কোনো বড় অসুখের সঙ্কেত হতে পারে। তাই এই সমস্যাকে কেবল একটি ব্যক্তিগত অস্বস্তি হিসেবে না দেখে, সামগ্রিক স্বাস্থ্যের আয়না হিসেবে দেখা জরুরি।
অস্বস্তির গভীরে লুকিয়ে থাকা কারণসমূহ:
মুখগহ্বরে ৮০-৮৫ শতাংশ দুর্গন্ধের উৎস থাকলেও বাকি ১৫-২০ শতাংশের নেপথ্যে থাকে অভ্যন্তরীণ শারীরিক জটিলতা। দীর্ঘদিনের গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সমস্যা বা অ্যাসিড রিফ্লাক্সের ফলে নিঃশ্বাসে টক বা পচা গন্ধ আসতে পারে। আবার সাইনাস বা গলার সংক্রমণের ফলে জমা হওয়া মিউকাস থেকেও দুর্গন্ধ ছড়ায়। সবথেকে উদ্বেগের বিষয় হলো, ডায়াবেটিস, কিডনি বা লিভারের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা থাকলেও রক্তে রাসায়নিক পরিবর্তনের প্রভাবে নিঃশ্বাসে বিশেষ এক ধরনের গন্ধ অনুভূত হয়। এমনকি শরীরে ভিটামিন সি এবং ডি-এর অভাব ঘটলে মাড়ি ও এনামেল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা ব্যাকটেরিয়া জন্মানোর আদর্শ ক্ষেত্র তৈরি করে।
ওরাল স্ক্রিনিং-এর অপরিহার্যতা:
মুখের দুর্গন্ধ নিরাময়ে আমরা অনেকেই বাজারচলতি মাউথওয়াশ বা ঘরোয়া টোটকার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ি। কিন্তু সমস্যার মূলে পৌঁছাতে ‘ওরাল স্ক্রিনিং’ বা নিয়মিত মুখগহ্বর পরীক্ষার কোনো বিকল্প নেই। একজন অভিজ্ঞ দন্তচিকিৎসক কেবল দাঁত নয়, বরং মাড়ি, জিভ এবং মুখের অভ্যন্তরীণ কলার সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো পর্যবেক্ষণ করেন। অনেক ক্ষেত্রে ওরাল স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমেই প্রাথমিক পর্যায়ে ওরাল ক্যানসার বা সিস্টেমিক ডিজিজ (যেমন ডায়াবেটিস) শনাক্ত করা সম্ভব হয়। বছরে অন্তত দু’বার চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রফেশনাল ক্লিনিং করানো কেবল দাঁত নয়, হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতেও সাহায্য করে বলে আধুনিক গবেষণা দাবি করছে।
সচেতনতা ও জীবনশৈলী:
সুস্থ থাকতে দৈনিক দু’বার ব্রাশ করার পাশাপাশি টাং ক্লিনার দিয়ে জিভ পরিষ্কার করা এবং খাওয়ার পর পর্যাপ্ত জল দিয়ে মুখ ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান করতে হবে।পর্যাপ্ত লালা বা স্যালাইভা নিঃসরণ মুখকে প্রাকৃতিকভাবে পরিষ্কার রাখে; তাই তামাক বা মদ্যপান বর্জন করা জরুরি, কারণ এগুলো মুখকে শুষ্ক করে তোলে। তার পরিবর্তে লবঙ্গ, দারুচিনি বা পুদিনা বা তুলসী পাতার ব্যবহার
এই সমস্যাকে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম।
মুখের স্বাস্থ্যকে অবহেলা করা মানে আসলে পুরো শরীরকেই ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া। দুর্গন্ধ কেবল দাঁতের ফাঁকে জমে থাকা খাবারের টুকরো নয়, এটি আপনার লিভার, কিডনি বা বিপাক প্রক্রিয়ার অব্যবস্থার কান্নার প্রতিধ্বনিও হতে পারে। তাই লজ্জায় মুখ না লুকিয়ে সঠিক সময়ে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। মনে রাখবেন, একটি নির্মল নিঃশ্বাস কেবল আপনার আত্মবিশ্বাস বাড়ায় না, এটি আপনার সুস্থ শরীরেরও প্রমাণ।।
