
পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় নাম বাদ যাওয়া এবং বিশেষ অনুসন্ধান বা S.I.R প্রক্রিয়ায় বয়স্ক ও বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের হেনস্থার অভিযোগ তুলে এবার রণংদেহি মেজাজে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাঁকুড়ার বড়জোড়ার সভা থেকে তিনি স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, একজনও বৈধ ভোটারের নাম বাদ গেলে দিল্লিতে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের দপ্তর ঘেরাও করবে তৃণমূল কংগ্রেস। এই ইস্যুতে কেন্দ্র ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার সমালোচনা করে রাজ্য সরকার মানবিকতার প্রশ্ন তুলেছে।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মূল অভিযোগ হলো, এসআইআর প্রক্রিয়ার নামে ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ-বৃদ্ধা এবং বিশেষভাবে সক্ষম মানুষদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখা হচ্ছে। প্রশাসনিক স্তরে এই অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার ফলে রাজ্যে ইতিমধ্য়েই বেশ কয়েকজনের মৃত্যুর খবর সামনে এসেছে, যার মধ্যে পুরুলিয়ার ৮২ বছরের বৃদ্ধ দুর্জন মাঝির মৃত্যু পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
রাজ্য সরকারের মতে, ডিজিটাল যুগে যেখানে তথ্য যাচাইয়ের একাধিক উপায় রয়েছে, সেখানে কেন বয়স্কদের সশরীরে হাজির হতে বাধ্য করা হচ্ছে? তৃণমূল নেতৃত্বের দাবি, এটি বাংলার ভোটারদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার একটি ‘গভীর ষড়যন্ত্র’। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, কমিশনকে স্বচ্ছতার খাতিরে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’-র তথ্য জনসমক্ষে আনতে হবে।
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ভোটার তালিকার শুদ্ধিকরণ একটি নিয়মিত সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। কমিশনের যুক্তি:
ভুয়া ভোটার ছাঁটাই: তালিকায় থাকা মৃত ব্যক্তি বা একই ব্যক্তির একাধিক জায়গায় নাম বাদ দিতেই এই বিশেষ অনুসন্ধান চালানো হয়।স্বচ্ছতা বজায় রাখা: আসন্ন নির্বাচনের আগে একটি নির্ভুল ভোটার তালিকা তৈরি করা কমিশনের আইনি বাধ্যবাধকতা।
কেন্দ্রীয় সরকারের ঘনিষ্ঠ বৃত্ত এবং বিরোধী দল বিজেপি-র দাবি, রাজ্যে বহু ভুয়া ভোটার এবং অনুপ্রবেশকারীর নাম তালিকায় ঢুকে পড়েছে, যা সরাতেই কমিশন কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। তাদের মতে, শাসক দল রাজনৈতিক স্বার্থে এই প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
পুরুলিয়ার ঘটনায় ইতিমধ্যেই মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়ালের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের করেছে মৃত বৃদ্ধের পরিবার। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ইস্যুটি কেবল প্রশাসনিক স্তরে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতের নতুন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। ভোটার তালিকা নির্ভুল হওয়া গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য, কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় যদি সাধারণ মানুষের প্রাণহানি ঘটে বা বয়স্কদের চূড়ান্ত ভোগান্তির শিকার হতে হয়, তবে তা ব্যবস্থার সংবেদনশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। নির্বাচন কমিশনের উচিত ছিল প্রযুক্তি ব্যবহার করে বা দুয়ারে পৌঁছে তথ্য যাচাই করা, যাতে সাধারণ মানুষকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে হয়রানির শিকার হতে না হয়। শেষ পর্যন্ত এই আইনি লড়াই ও রাজনৈতিক আন্দোলন কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার।।
