
উদ্ভাবন বা প্রযুক্তি কেবল গবেষণাগার কিংবা বড় শহরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গণ্ডিতে আটকে থাকলে চলবে না; তার প্রকৃত সার্থকতা তখনই, যখন তার সুফল দেশের প্রতিটি স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছাবে। দিল্লিতে আয়োজিত ২৮তম বার্ষিক কমনওয়েলথ স্পিকার্স অ্যান্ড প্রেসাইডিং অফিসার্স কনফারেন্সে (CSPOC) বক্তব্য রাখতে গিয়ে এই বার্তাই দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তাঁর মতে, নতুন ভাবনার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে ভারতের শক্তিশালী গণতান্ত্রিক কাঠামো এবং অনন্য বৈচিত্র্যের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “ভারত একটি বৈচিত্র্যময় দেশ। এখানে এক এক অঞ্চলের ভৌগোলিক ও সামাজিক বাস্তব এক এক রকম। তাই এক দেশ বা এক সমাজের জন্য তৈরি করা সমাধান সব জায়গায় খাটবে না।” উদ্ভাবনের পরিকল্পনায় স্থানীয় চাহিদা ও প্রান্তিক মানুষের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর তিনি বিশেষ জোর দেন। মোদীর দাবি, ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ফলেই উদ্ভাবনের সুফল ভিন্ন ভিন্ন স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে।
মোদীর দৃষ্টিভঙ্গি কেবল দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। তিনি জানান, উদ্ভাবনের সুফল যাতে ‘গ্লোবাল সাউথ’ এবং কমনওয়েলথভুক্ত উন্নয়নশীল দেশগুলো পায়, ভারত সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে। প্রযুক্তি ও জ্ঞানের আদানপ্রদান এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই যে একটি টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব, সেই কথা আবারও মনে করিয়ে দেন তিনি। তাঁর মতে, বর্তমান বিশ্বে এককভাবে এগিয়ে যাওয়ার দিন শেষ; এখন সময় ভাগাভাগি ও সহযোগিতার।
উন্নয়ন ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে নারীশক্তির গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা আলাদাভাবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “ভারতের উন্নয়ন যাত্রায় নারীরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন। উদ্ভাবন ও প্রযুক্তির সুবিধা যদি নারীদের কাছে পৌঁছায়, তবে তার ইতিবাচক প্রভাব সমাজের প্রতিটি কোণায় পড়বে।” শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং স্বনির্ভরতার ক্ষেত্রে নারী-কেন্দ্রিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে বলেও তিনি জানান।
স্টার্ট-আপ ইন্ডিয়া, ডিজিটাল ইন্ডিয়া এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির মতো প্রকল্পগুলোর উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার এমন এক পরিবেশ তৈরি করতে চাইছে যেখানে তরুণরা নতুন কিছু করার সুযোগ পায় এবং তার ফলে তৈরি হওয়া কর্মসংস্থান দেশের সাধারণ মানুষের উপকারে আসে। উদ্ভাবন মানে কেবল নতুন যন্ত্র বা অ্যাপ তৈরি নয়, বরং শাসনব্যবস্থা এবং পরিষেবা প্রদানের ক্ষেত্রেও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আনা।
মোদীর বক্তব্যের মূল সুর ছিল ‘অন্তর্ভুক্তি’। তিনি স্পষ্ট করে দেন, উদ্ভাবনের সুফল যদি গ্রাম, প্রান্তিক অঞ্চল, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও পিছিয়ে পড়া মানুষের জীবনে পরিবর্তন না আনে, তবে সেই উদ্ভাবনের উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়। শহর বা বড় শিল্পকেন্দ্রের বাইরে বেরিয়ে দেশের প্রতিটি নাগরিকের জীবনে প্রযুক্তির আলো পৌঁছে দিতে তাঁর সরকার নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। কমনওয়েলথ সম্মেলনের মঞ্চ থেকে নরেন্দ্র মোদী যে বার্তা দিলেন, তা স্পষ্ট—উন্নয়ন হতে হবে সবার জন্য। উদ্ভাবনকে হাতিয়ার করে সমাজের শেষ প্রান্তে থাকা মানুষের জীবন সহজ করাই ভারতের আগামীর লক্ষ্য। এই অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গিই আধুনিক ভারতকে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।।
