
আদর্শ বনাম বাস্তব—এই দুইয়ের লড়াইয়ে আপাতত বাস্তবকেই গুরুত্ব দিচ্ছে কেরল সিপিএম। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতা ধরে রাখতে নিজেদের দীর্ঘদিনের ‘কঠোর’ নীতিতে বড়সড় বদল আনতে চলেছে এ কে গোপালন ভবন। দলীয় সূত্রে খবর, টানা দু’বারের বেশি বিধায়ক হওয়া নেতাদের টিকিট না দেওয়ার যে নিয়ম ছিল, জয়ের স্বার্থে এবার তা শিথিল করা হতে পারে। আর এই রণকৌশলের মধ্যমণি হিসেবে থাকছেন মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন।
সিপিএমের অন্দরে দীর্ঘকাল ধরে নিয়ম ছিল, নতুনদের সুযোগ দিতে অভিজ্ঞ নেতাদের দু’বারের বেশি প্রার্থী করা হবে না। কিন্তু সাম্প্রতিক পঞ্চায়েত ও পুরসভা নির্বাচনের ফল বাম নেতৃত্বের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। কেরলের বহু জায়গায় এলডিএফ (LDF) বা বামফ্রন্টের ভোটব্যাঙ্কে ধস নেমেছে এবং তারা সংখ্যালঘু হয়ে পড়েছে। এই কঠিন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে দল বুঝতে পারছে, কেবল নতুন মুখ দিয়ে বৈতরণী পার হওয়া সম্ভব নয়। ভোটারদের কাছে পরিচিত এবং পরীক্ষিত নেতাদের লড়াইয়ের ময়দানে রাখা এখন সময়ের দাবি।
কেরল সিপিএমের একটি বড় অংশ মনে করে, শত বিতর্কের মাঝেও পিনারাই বিজয়নের প্রশাসনিক দৃঢ়তা এবং ইমেজই দলের সবচেয়ে বড় শক্তি। পর পর দু’বার ক্ষমতায় আসার পিছনে তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার বড় ভূমিকা ছিল। তাই আসন্ন নির্বাচনেও তাঁকেই দলের প্রধান মুখ হিসেবে প্রোজেক্ট করা হচ্ছে। অভিজ্ঞ বিধায়কদের ফেরানোর অর্থ হলো, বিজয়নের পাশে একঝাঁক পোড়খাওয়া নেতাকে রাখা, যাঁরা নিজের নিজের এলাকায় সাংগঠনিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী। দলের এই সম্ভাব্য সিদ্ধান্তে যে বিতর্কের অবকাশ নেই, তা নয়। তরুণ প্রজন্মের অনেক কর্মী মনে করছেন, নীতি শিথিল হলে নতুন নেতৃত্বের উঠে আসার পথ রুদ্ধ হবে। আবার আদর্শবাদীদের একাংশের মতে, নিয়ম ভাঙলে দলের শৃঙ্খলায় আঘাত আসতে পারে। তবে বাস্তববাদী নেতাদের পাল্টা যুক্তি হলো, বাংলায় যে পরিস্থিতি হয়েছে, কেরলে তার পুনরাবৃত্তি রুখতে জয় ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। স্থানীয় নির্বাচনে যে ধাক্কা লেগেছে, তা সামলাতে অভিজ্ঞতার কোনো বিকল্প নেই।
সিপিএম নেতৃত্ব এখন মূলত আসন ধরে ধরে পর্যালোচনায় ব্যস্ত। যেখানে নতুনদের দিয়ে জেতা সম্ভব নয়, সেখানেই অভিজ্ঞ ও পুরনো বিধায়কদের আবারও লড়াইয়ে নামানো হবে। এর ফলে একদিকে যেমন প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে, অন্যদিকে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এড়ানোও সহজ হবে বলে মনে করা হচ্ছে। কেরলের রাজনীতিতে গত কয়েক দশকে কোনো দল টানা তিনবার ক্ষমতায় আসেনি। সিপিএম সেই রেকর্ড গড়তে চায়। আর সেই অসম্ভবকে সম্ভব করতে ‘দু’বার বিধায়ক’ হওয়ার পুরনো আবেগকে বিসর্জন দিয়ে জেতার ক্ষমতাকেই (Winability) মূল মাপকাঠি করতে চাইছে দল। পিনারাই বিজয়নের নেতৃত্বে বামফ্রন্ট কি পারবে কেরলের ইতিহাস বদলে দিতে? উত্তর দেবে সময়, তবে যুদ্ধের প্রস্তুতিতে যে তারা কোনো খামতি রাখছে না, তা এই নীতি পরিবর্তনের ভাবনা থেকেই স্পষ্ট।।
