
সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের জনতাত্ত্বিক পরিবর্তন নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ‘এসআইআর’ (SIR) বা ‘সেটেলমেন্ট ইনফরমেশন রেজিস্টার’। কেন্দ্রীয় সরকার ও বিজেপি নেতৃত্ব বারবার দাবি করছেন যে, রাজ্যে অনুপ্রবেশের কারণে জনতাত্ত্বিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ২০১১ সালের জনগণনার পরিসংখ্যান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ভারতের অন্যান্য রাজ্য থেকে পশ্চিমবঙ্গে আসা মানুষের সংখ্যা ২৩.৯০ লক্ষ, আর বিদেশ থেকে আসা মানুষের সংখ্যা ২০.০৬ লক্ষ। অর্থাৎ, ২০০১ থেকে ২০১১—এই দশ বছরে বিদেশি বহিরাগতদের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় সাড়ে সাত গুণ। এই সংখ্যাতত্ত্বই এখন বিজেপির রাজনীতির সামনে এক কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।
বিজেপির রাজনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো অনুপ্রবেশ ইস্যু। বিশেষ করে সীমান্ত দিয়ে আসা মানুষ কীভাবে রাজ্যের ধর্মীয় ও সামাজিক ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে, তা নিয়ে তারা সোচ্চার। এই লক্ষ্যেই এসআইআর-এর মতো প্রক্রিয়ার কথা ভাবা হয়, যাতে জনবসতির বিস্তারিত তথ্য হাতে নিয়ে অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করা যায়। কিন্তু পরিসংখ্যানের আয়নায় তাকালে দেখা যাচ্ছে, ভিন রাজ্য থেকে আসা মানুষের চাপও এ রাজ্যে কম নয়। এই ‘বহিরাগত’ সংজ্ঞার জটিলতায় বিজেপি এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়েছে যেখানে তাদের প্রধান রাজনৈতিক অস্ত্রটিই তাদের দিকে ঘুরে যেতে পারে।
তৃণমূল কংগ্রেস বা আঞ্চলিক দলগুলো বরাবরই ‘বাঙালি বনাম বহিরাগত’ তাস খেলে আসছে। বিজেপি যখনই অনুপ্রবেশের কথা বলে, পাল্টা যুক্তিতে উঠে আসে হিন্দিভাষী বা ভিন রাজ্য থেকে আসা মানুষের আধিক্যের কথা। ২০১১-র তথ্য অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ পরিযান যদি বিদেশি অনুপ্রবেশের প্রায় সমান হয়, তবে বিজেপি কাকে ‘বহিরাগত’ বলবে? যদি তারা শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ে অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত করতে চায়, তবে তা সাংবিধানিক ও আইনি জটিলতায় পড়বে। আবার যদি তারা সব বহিরাগতর বিরুদ্ধে সরব হয়, তবে তাদের বড় ভোটব্যাঙ্ক—যারা ভিন রাজ্য থেকে এসে এখানে স্থায়ী হয়েছেন—তারা ক্ষুব্ধ হতে পারেন। এখানেই কৌশলের পাল্টা প্রভাব বা ‘বুমেরাং’ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন সামনে রেখে বিজেপি মেরুকরণের রাজনীতিকে তীব্র করতে চাইছে। কিন্তু এই জনতাত্ত্বিক বিতর্ক তাদের সামনে এক অদ্ভুত দ্বিধা তৈরি করেছে। একদিকে তারা হিন্দু শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বলছে (সিএএ), অন্যদিকে অনুপ্রবেশের তথ্য দিয়ে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করছে। যদি জনশুমারির তথ্য অনুযায়ী বিদেশি অনুপ্রবেশকারী সংখ্যায় এত বেশি হয়, তবে বিগত এক দশকে কেন্দ্রীয় সুরক্ষা বাহিনী বা বিএসএফ কেন তা রুখতে পারল না—সেই প্রশ্নও অবধারিতভাবে উঠছে। এই টানাপোড়েনের প্রভাব সরাসরি পড়ছে সাধারণ রাজ্যবাসীর ওপর। দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্প্রীতি ও প্রতিবেশীসুলভ পরিবেশে সন্দেহের ছায়া ঘনীভূত হচ্ছে। সাধারণ মানুষ যখন দেখছেন যে রাজনৈতিক দলগুলো কেবল নিজেদের ভোটব্যাঙ্ক সুরক্ষিত করতে মানুষকে সংখ্যার নিরিখে ভাগ করছে, তখন তাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে।
পরিশেষে বলা যায়, বিজেপি যে ‘অনুপ্রবেশ’ বা ‘জনতাত্ত্বিক পরিবর্তন’-এর তিরটি ছুড়েছিল রাজ্যের শাসকদলকে ঘায়েল করতে, তা এখন তাদের দিকেই ফিরে আসছে। তথ্যের অসঙ্গতি এবং কৌশলের অভাব এই তিরকে ‘আত্মঘাতী’ করে তুলছে। কারণ, শুধুমাত্র একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে নিশানা করতে গিয়ে তারা যদি রাজ্যের সামগ্রিক জনতাত্ত্বিক জটিলতাকে অস্বীকার করে, তবে বাংলার সচেতন ভোটাররা সেই বিভাজনের রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। তিরের অভিমুখ যদি জনতত্ত্বের সঠিক বিচার না করে কেবল আবেগের ওপর নির্ভর করে, তবে তা নিজের দলেরই ক্ষতি ত্বরান্বিত করবে।I
