
মুম্বই: ভারতীয় সঙ্গীত জগতের এক বর্ণিল ও ঐতিহাসিক অধ্যায়ের অবসান। রবিবার মুম্বইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী আশা ভোঁসলে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। গত শনিবার অত্যধিক ক্লান্তি এবং বুকের সংক্রমণ নিয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। তাঁর প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অগুনতি ভক্ত ও অনুরাগীদের মধ্যে।
আশা ভোঁসলের প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তিনি এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন, “আশা ভোঁসলেজির প্রয়াণে আমি গভীরভাবে শোকাহত। ভারতের অন্যতম আইকনিক ও বহুমুখী কণ্ঠস্বর হিসেবে কয়েক দশক ধরে তিনি আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর সুরের মূর্ছনা চিরকাল মানুষের হৃদয়ে অনুরণিত হবে।”
কিংবদন্তি সংঙ্গীতশিল্পীর প্রয়াণে শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু। তিনি জানান, “আশা ভোঁসলে প্রয়াণ সঙ্গীত জগতে এক বিরাট শূন্যতা সৃষ্টি করেছে। এক জন কিংবদন্তিতুল্য গায়িকা হিসাবে তাঁর অসাধারণ কর্মজীবন ভারতের সঙ্গীতের একটি যুগকে সংজ্ঞায়িত করেছে। এক জন শিল্পী ও মানুষ হিসাবে তিনি নিজের শর্তে জীবনযাপন করেছেন। তাঁর সুমধুর ও কালজয়ী কণ্ঠ দিয়ে তিনি কয়েক দশক ধরে ভারতীয় সঙ্গীতকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর সঙ্গীত চিরকাল বেঁচে থাকবে। তাঁর মৃত্যু সঙ্গীতপ্রেমীদের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। আমি তাঁর পরিবার ও অগণিত অনুরাগীদের প্রতি আমার আন্তরিক সমবেদনা জানাই।”
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শোকবার্তায় বলেন, “মহান সঙ্গীত প্রতিভা আশা ভোঁসলের প্রয়াণে আমি মর্মাহত। তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আমাদের হৃদয়ে রাজত্ব করেছেন। তাঁর গাওয়া অজস্র বাংলা গান এখানে অত্যন্ত জনপ্রিয়। ২০১৮ সালে আমরা তাঁকে ‘বঙ্গবিভূষণ’ সম্মানে ভূষিত করেছিলাম।”
বলিউডের বর্ষীয়ান অভিনেত্রী হেমা মালিনী আবেগঘন বার্তায় বলেন, “আশা তাই আর নেই, এটা বিশ্বাস করা কঠিন। আমার ফিল্মি কেরিয়ারের উত্থানে লতা দিদি ও আশা দিদির অবদান অপরিসীম। আমার অসংখ্য গান তাঁর অনন্য গায়কীর কারণেই জনপ্রিয় হয়েছে।”
অভিনেতা অক্ষয় কুমার, ক্রিকেটার ঝুলন গোস্বামী এবং বায়োকন প্রধান কিরণ মজুমদার-শও সহ বিশিষ্টজনেরা শিল্পীকে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।
হাসপাতালের চিকিৎসক প্রতীত সামদানি শিল্পীর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, “অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে আশা ভোঁসলে আজ আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছেন। তিনি বার্ধক্যজনিত একাধিক শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত অঙ্গ বিকল হওয়ার কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।” মহারাষ্ট্রের সংস্কৃতি মন্ত্রী আশীষ শেলার হাসপাতালের সামনে উপস্থিত হয়ে শিল্পীর প্রয়াণের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন।
আশা ভোঁসলের পুত্র আনন্দ ভোঁসলে জানিয়েছেন, সোমবার সকাল ১১টা থেকে শিল্পীর বাসভবনে তাঁর মরদেহ রাখা হবে শেষ শ্রদ্ধার জন্য। বিকেল ৪টে নাগাদ মুম্বইয়ের শিবাজি পার্কে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে।
১৯৩৩ সালে জন্মগ্রহণ করা আশা ভোঁসলে গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ড অনুযায়ী বিশ্বের সবচেয়ে বেশি গান রেকর্ড করা শিল্পী। দীর্ঘ আট দশকেরও বেশি সময়ের কেরিয়ারে ২০টিরও বেশি ভারতীয় ভাষায় ১২ হাজারেরও বেশি গান গেয়েছেন তিনি।
২০০০ সালে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার এবং ২০০৮ সালে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘পদ্মবিভূষণ’ লাভ করেন তিনি। এ ছাড়াও পেয়েছেন মহারাষ্ট্র ভূষণ ও বঙ্গবিভূষণের মতো একাধিক সম্মান। মীনা কুমারী, মধুবালা থেকে শুরু করে কাজল বা উর্মিলা মাতণ্ডকর, সব প্রজন্মের নায়িকার কণ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন তিনি। ধ্রুপদী গজল থেকে শুরু করে পপ বা চটুল নাচ সব ঘরানাতেই তাঁর বিচরণ ছিল অবাধ।
তাঁর মৃত্যুতে লতা মঙ্গেশকর পরবর্তী যে শূন্যতা তৈরি হলো, তা অপূরণীয়। তবে তাঁর কালজয়ী সুরের মাঝেই তিনি বেঁচে থাকবেন কোটি কোটি সঙ্গীতপ্রেমীর হৃদয়ে।

