দুর্গাপুর: তারাতলায় নির্মীয়মাণ গুদামের শেড ধসে এখনও পর্যন্ত ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। একাধিক আহতের চিকিৎসা চলছে হাসপাতালে। ধ্বংসস্তূপে এখনও কেউ আটকে রয়েছেন কি না, তা জানতে সেনা, এনডিআরএফ, দমকল ও রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর যৌথ উদ্ধার অভিযান অব্যাহত। এই আবহেই দুর্ঘটনার দায় নির্ধারণ এবং তদন্তের গতিপ্রকৃতি নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক তরজা শুরু হল। শুক্রবার দুর্গাপুরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল সরাসরি প্রশ্ন তুললেন, “শুধু ওএসডি কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কেন? তৎকালীন পুরমন্ত্রী ও কলকাতার প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমকে কেন গ্রেপ্তার করা হবে না?”
দুর্গাপুরের সেন্ট্রাল মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিএমইআরআই)-এ বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ প্রযুক্তি পরিদর্শনে এসে অগ্নিমিত্রা জানান, রাজ্যের শহরাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে আবর্জনা ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমস্যা রয়েছে। সেই সমস্যা সমাধানে কেন্দ্রীয় সরকারের সহায়তায় সিএমইআরআই-এর প্রযুক্তি ব্যবহার করে আধুনিক বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন দুর্গাপুরের দুই বিধায়ক লক্ষ্মণচন্দ্র ঘড়ুই ও চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায়, পশ্চিম বর্ধমানের জেলাশাসক পুন্নামবলম এস-সহ একাধিক আধিকারিক।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে তারাতলা বিপর্যয়ের প্রসঙ্গে অগ্নিমিত্রা বলেন, “এই ঘটনায় সিট গঠন হয়েছে। কিন্তু শুধু একজন ওএসডিকে গ্রেপ্তার করলেই তদন্ত শেষ হয়ে যায় না। যে সময় এই নির্মাণের অনুমোদন হয়েছে এবং কাজ চলেছে, সেই সময় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকাও খতিয়ে দেখা উচিত।”
মন্ত্রীর দাবি, প্রাথমিকভাবে যে তথ্য সামনে এসেছে, তাতে নির্মাণের গুণগত মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। তাঁর অভিযোগ, “এত বড় কাঠামো তৈরি করা হচ্ছিল নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করে। বর্ষার বৃষ্টি শুরু হতেই কাঠামো ভেঙে পড়েছে। ১৫টি প্রাণ চলে গেল। বহু শ্রমিক এখনও মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। এই ঘটনার নৈতিক ও প্রশাসনিক দায় এড়ানো যায় না।”
তিনি আরও বলেন, “আইনের চোখে সবাই সমান। যদি তদন্তে কারও ভূমিকা সামনে আসে, তা হলে তিনি যত বড় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বই হোন না কেন, তাঁকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে। শুধু ওএসডিকে গ্রেপ্তার করে তদন্ত শেষ করা উচিত নয়।” এ ব্যাপারে প্রয়োজনে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধেও তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অগ্নিমিত্রা পাল ৷
উল্লেখ্য, তারাতলার গুদাম ধসের পর রাজ্য সরকার বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠন করেছে। তদন্তে ইতিমধ্যেই কলকাতা পুরসভার তৎকালীন ওএসডি কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তকারীরা নির্মাণের অনুমোদন প্রক্রিয়া, নিরাপত্তা বিধি মানা হয়েছিল কি না, নির্মাণসামগ্রীর গুণমান এবং প্রশাসনিক ভূমিকা— সব দিকই খতিয়ে দেখছেন।
এরই মধ্যে কলকাতা পুরসভার একটি অনুমোদন-সংক্রান্ত নথি প্রকাশ্যে এসেছে, যেখানে তৎকালীন মেয়র ফিরহাদ হাকিমের স্বাক্ষর রয়েছে। সেই নথিকে সামনে রেখে পদ্ম শিবিরের দাবি, অনুমোদন প্রক্রিয়ার প্রতিটি স্তরের ভূমিকা তদন্তের আওতায় আনা উচিত। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও প্রকল্পের অনুমোদনের নথিতে স্বাক্ষর থাকা মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ফৌজদারি অপরাধে দায়ী— এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। প্রকৃত দায় নির্ভর করবে তদন্তে উঠে আসা তথ্য ও প্রমাণের উপর।
প্রসঙ্গত, অগ্নিমিত্রা পালের এই মন্তব্যের বিষয়ে এখনও পর্যন্ত ফিরহাদ হাকিমের কোনও প্রতিক্রিয়া প্রকাশ্যে আসেনি। তদন্তকারী সংস্থাও তাঁর বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেয়নি। ফলে রাজনৈতিক অভিযোগ এবং আইনি তদন্ত-এই দুই প্রক্রিয়াকে আলাদা রেখেই এখন নজর তদন্তের পরবর্তী অগ্রগতির দিকে।
প্রয়োজনে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধেও তদন্তের দাবি!