গ্যাংটক, ২৬ জুন: পাহাড়ের বুকজুড়ে শুধু বরফ আর নীরবতা। কোথাও হিমাঙ্কের নীচে নেমে যাওয়া তাপমাত্রা, কোথাও আবার অক্সিজেনের তীব্র ঘাটতি। তারই মধ্যে প্রায় ১৭ হাজার ফুট উচ্চতায় দিন-রাত এক করে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর জওয়ানরা। পূর্ব সিকিমের দুর্গম সীমান্তে চলছে ‘ত্রি শক্তি কোর’-এর বিশেষ উচ্চ-পার্বত্য প্রশিক্ষণ। উদ্দেশ্য একটাই-যে কোনও পরিস্থিতিতে, যে কোনও মুহূর্তে দেশের সীমান্ত রক্ষায় প্রস্তুত থাকা।
ভারত-চীন সীমান্ত সংলগ্ন এই কৌশলগত অঞ্চলে সেনার প্রশিক্ষণ শুধু অস্ত্র চালানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রকৃতির সবচেয়ে প্রতিকূল পরিবেশকে সঙ্গী করেই যুদ্ধক্ষেত্রে টিকে থাকার সক্ষমতা গড়ে তোলাই এই মহড়ার মূল লক্ষ্য। খাড়া বরফঢাকা ঢাল বেয়ে দ্রুত এগিয়ে যাওয়া, ভারী অস্ত্র ও রসদ কাঁধে নিয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম, কম অক্সিজেনের পরিবেশেও নিখুঁত লক্ষ্যভেদ! প্রতিটি অনুশীলনই বাস্তব যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রতিরূপ।
বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে অ্যাডভান্সড স্কিইং প্রশিক্ষণে। কারণ বরফে ঢাকা পাহাড়ি এলাকায় দ্রুত সেনা মোতায়েন কিংবা আকস্মিক অভিযানের ক্ষেত্রে স্কিইং-দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে পাহাড়ি ঢালে বিশেষ অস্ত্র পরিচালনা, উচ্চতায় যুদ্ধ পরিচালনার কৌশল এবং সীমিত সম্পদে দীর্ঘ সময় টিকে থাকার অনুশীলনও চলছে সমানতালে।
এই প্রশিক্ষণের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল বিপর্যয় মোকাবিলা। পূর্ব হিমালয়ে তুষারধস একটি বড় ঝুঁকি। তাই সেনাদের শেখানো হচ্ছে বরফের স্তরের গঠন বিশ্লেষণ, তুষারধসের পূর্বাভাস চিহ্নিত করা এবং বিপজ্জনক এলাকা এড়িয়ে অভিযান পরিচালনার কৌশল। পাশাপাশি গভীর বরফে আটকে পড়া সেনা বা সাধারণ মানুষকে দ্রুত উদ্ধার, জরুরি চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়া এবং অনুসন্ধান অভিযান চালানোর মহড়াও নিয়মিত হচ্ছে।
ত্রি শক্তি কোরের কর্নেল গৌরভ জাডৌন বলেন, "প্রযুক্তি আমাদের শক্তি বাড়ায়, কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে শেষ কথা বলে জওয়ানদের মানসিক দৃঢ়তা, দক্ষতা এবং দলগত সমন্বয়। এই কঠোর প্রশিক্ষণ তাঁদের যে কোনও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে লড়াই করার ক্ষমতা আরও বাড়িয়ে তোলে।"
উত্তরবঙ্গের সুকনায় সদর দফতর থাকা ত্রি শক্তি কোরের দায়িত্ব উত্তরবঙ্গ, সিকিম এবং ভারত-চীন সীমান্তের বিস্তীর্ণ সংবেদনশীল এলাকা। সেই কারণেই আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধের পাশাপাশি পাহাড়ের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতাকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে ভারতীয় সেনাবাহিনী।
সেনা কর্তাদের মতে, এই প্রশিক্ষণ কেবল সীমান্ত রক্ষার প্রস্তুতিকেই আরও শক্তিশালী করে না, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ও তা কার্যকর ভূমিকা নেয়। তুষারধস, হড়পা বান কিংবা পাহাড়ি বিপর্যয়ের সময়ে দুর্গম অঞ্চলে উদ্ধারকাজে সবচেয়ে আগে পৌঁছে যান এই বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জওয়ানরাই। তাই এই মহড়া শুধু যুদ্ধজয়ের প্রস্তুতি নয়, মানবিক দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাকেও আরও সমৃদ্ধ করে তুলছে।
অক্সিজেনের তীব্র ঘাটতি, হিমাঙ্কের নীচে তাপমাত্রা, তুষারধসের আশঙ্কা ! তারই মধ্যে নিজেদের আরও শানিয়ে নিচ্ছেন জওয়ানরা