পশ্চিমবঙ্গে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউনিফর্ম সিভিল কোড বা ইউসিসি) চালুর পথে রাজ্য সরকার। আগামী ২৯ জুন বিধানসভায় এই সংক্রান্ত বিল পেশ করা হতে পারে। উত্তরাখণ্ড ও গুজরাটের পর এবার পশ্চিমবঙ্গেও এই আইন চালুর উদ্যোগ ঘিরে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। বিলটি পাস হলে বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার, দত্তক গ্রহণ, ভরণপোষণ এবং সম্পত্তি বণ্টনের মতো ব্যক্তিগত বিষয়গুলিতে ধর্মভেদে আলাদা আইন না থেকে সকল নাগরিকের জন্য একটিই অভিন্ন আইন কার্যকর হতে পারে।
অভিন্ন দেওয়ানি বিধির মূল উদ্দেশ্য হল ধর্ম নির্বিশেষে দেশের সব নাগরিকের জন্য একই ধরনের দেওয়ানি আইন কার্যকর করা। বর্তমানে হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, পার্সি-সহ বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্য পৃথক ব্যক্তিগত আইন রয়েছে। ইউসিসি কার্যকর হলে সেই পৃথক আইনের পরিবর্তে একক আইনি কাঠামো চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভারতের সংবিধানের ৪৪ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রণয়নের চেষ্টা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে এটি রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতির অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় আদালতের মাধ্যমে তা বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর করা যায় না। অন্যদিকে সংবিধানের ২৫, ২৬ এবং ২৯ নম্বর অনুচ্ছেদ ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিজস্ব সংস্কৃতি রক্ষার অধিকারও নিশ্চিত করেছে। ফলে ইউসিসি নিয়ে সমর্থন ও বিরোধিতা দুই মতই সামনে এসেছে।
ইউসিসি সমর্থকদের দাবি, এই আইন কার্যকর হলে নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত হবে। উত্তরাধিকার, ভরণপোষণ ও সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে বৈষম্য কমবে এবং আইনের চোখে সকল নাগরিক সমান মর্যাদা পাবেন। পাশাপাশি জাতীয় ঐক্য আরও সুদৃঢ় হবে বলেও তাঁদের মত।
অন্যদিকে বিরোধীদের আশঙ্কা, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু হলে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নিজস্ব রীতি-নীতি ও ব্যক্তিগত আইনের উপর হস্তক্ষেপ হতে পারে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একাংশের দাবি, সংখ্যাগরিষ্ঠের আইন বা সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
উত্তরাখণ্ডে ইতিমধ্যেই কার্যকর ইউসিসিতে বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করা হয়েছে, লিভ-ইন সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং সেই সম্পর্কে জন্ম নেওয়া সন্তানকে বৈধ সন্তানের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ছেলে ও মেয়ের সমান উত্তরাধিকার অধিকার এবং সব সম্প্রদায়ের জন্য একই দত্তক গ্রহণের নিয়মও সেখানে কার্যকর হয়েছে। অসমেও প্রস্তাবিত ইউসিসিতে বিয়ের ন্যূনতম বয়স, মহিলাদের সম্পত্তির অধিকার, বহুগামিতা নিষিদ্ধকরণ এবং বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদের বাধ্যতামূলক নিবন্ধনের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার কথা জানানো হয়েছে।
এখন নজর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার দিকে। রাজ্যের প্রস্তাবিত অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বিলে ঠিক কোন কোন বিধান রাখা হয় এবং তা কতটা পরিবর্তন আনে, সেটাই আগামী দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে চলেছে।
পশ্চিমবঙ্গে আসছে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি, কী বদল হতে পারে?