ভোটে পরাজয়ের ধাক্কা সামলানোর আগেই তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে কার্যত পূর্ণমাত্রার গৃহযুদ্ধ। সোমবার বিদ্রোহী শিবির এমন এক সিদ্ধান্ত নিল, যা দলের ২৮ বছরের ইতিহাসে নজিরবিহীন। বিদ্রোহী বিধায়ক ও নেতাদের বৈঠকে চেয়ারম্যান পদ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরিয়ে দিয়ে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করা হল হাওড়া মধ্যের বিধায়ক অরূপ রায়ের নাম। একই সঙ্গে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘সাসপেন্ড’ করার ঘোষণাও করা হয়েছে।

বিধানসভার বাজেট অধিবেশন শেষে নিউ টাউনের একটি হোটেলে বসেছিল বিদ্রোহী শিবিরের বৈঠক। দাবি করা হয়েছে, সেখানে উপস্থিত ছিলেন প্রায় ৬০ জন বিধায়ক এবং কলকাতার প্রায় ৭০ জন প্রাক্তন কাউন্সিলর। বৈঠকের পর ঘোষণা করা হয় ৩০ সদস্যের নতুন জাতীয় কর্মসমিতি গঠনের কথা।

বিদ্রোহীদের দাবি, তৃণমূলের গঠনতন্ত্রের ২০ নম্বর ধারা অনুযায়ী প্রতি তিন বছর অন্তর জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠক ডাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু ২০২২ সালের পর আর সেই বৈঠক হয়নি। তাই পুরনো কর্মসমিতি ভেঙে দিয়ে নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেই কমিটির চেয়ারম্যান হয়েছেন অরূপ রায়। সহ-সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছেন প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, ফিরহাদ হাকিম এবং রথীন ঘোষ। সাধারণ সম্পাদকদের তালিকায় রয়েছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, জাভেদ খান, সন্দীপন সাহা এবং সাবিনা ইয়াসমিন। কোষাধ্যক্ষ করা হয়েছে আখরুজ্জামানকে।

রাজনৈতিক মহলের মতে, এটি শুধুমাত্র সাংগঠনিক পুনর্গঠন নয়, বরং তৃণমূলের মূল নেতৃত্বের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য ক্ষমতা দখলের লড়াই। এই বিদ্রোহের বীজ অবশ্য রোপিত হয়েছিল বিধানসভার বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে ঘিরে তথাকথিত ‘সই-কাণ্ড’-এর সময়। অভিযোগ ওঠে, স্পিকারের কাছে পাঠানো একটি চিঠিতে কয়েক জন বিধায়কের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছিল। প্রথম প্রকাশ্যে এই অভিযোগ তোলেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহা। সেই বিতর্কের পর থেকেই দলের ভাঙন স্পষ্ট হতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত ৫৮ জন বিধায়কের সমর্থনে ঋতব্রতকে বিরোধী দলনেতা নির্বাচিত করা হয়।

তবে রাজনৈতিক নাটকের কেন্দ্রবিন্দু এখন শুধু দলীয় নেতৃত্ব নয়, দলের বিপুল আর্থিক সম্পদও। তৃণমূলের প্রায় ৪৪০ কোটি টাকা থাকা তিনটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বর্তমানে ফ্রিজ হয়ে রয়েছে। সেই অ্যাকাউন্টের লেনদেন চালুর দাবিতে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে মমতা-ঘনিষ্ঠ শিবির।
দলের পক্ষে আদালতে দাবি করা হয়েছে, একটি ভুয়ো অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশের অনুরোধে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ লেনদেন বন্ধ করে দিয়েছে। অন্যদিকে বিদ্রোহী শিবিরের অভিযোগ, দলের তহবিল পরিচালনায় দীর্ঘদিন ধরেই স্বচ্ছতার অভাব ছিল।

একদিকে প্রতীক, সংগঠন এবং নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষ, অন্যদিকে শত কোটি টাকার দলীয় তহবিলের উপর কর্তৃত্বের লড়াই। সবমিলিয়ে একদা কংগ্রেস ভেঙে যে তৃণমূল কংগ্রেসের জন্ম দিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অদূর ভবিষ্যতে সেই দলের কর্তৃ্ত্ব এবং তহবিল মমতা নিজের দখলে রাখতে পারেন কিনা, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ৷