এক পর্দা বিস্ময়ের নাম বায়োস্কোপ! কলকাতাতেই লেখা হয়েছিল ভারতীয় সিনেমার প্রথম অধ্যায়

কলকাতা: আজকের দিনে সিনেমা মানে ওটিটি, মাল্টিপ্লেক্স, মোবাইলের স্ক্রিন কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ। কিন্তু একসময় চলমান ছবি দেখাই ছিল অলৌকিক অভিজ্ঞতা। অন্ধকার ঘরে সাদা পর্দার উপর হঠাৎ মানুষ, ঘোড়া কিংবা ট্রেনকে নড়াচড়া করতে দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন কলকাতার দর্শকরা। সেই বিস্ময়ের নামই ছিল—‘বায়োস্কোপ’। আর সেই বায়োস্কোপের হাত ধরেই ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রথম অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল কলকাতায়।

১৮৯৫ সালে ফ্রান্সে লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয়ের সিনেমাটোগ্রাফ প্রদর্শনের মাত্র দু’বছরের মধ্যেই, ১৮৯৭ সালে কলকাতায় প্রথম চলমান ছবি প্রদর্শিত হয়। তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী কলকাতা নতুন প্রযুক্তি ও শিল্পমাধ্যম গ্রহণে সবসময়ই অগ্রগামী ছিল। তাই ইউরোপে জন্ম নেওয়া সিনেমার জাদুও খুব দ্রুত পৌঁছে যায় হুগলির তীরে।
প্রথমদিকে বিদেশি প্রদর্শকরা বিভিন্ন নাট্যগৃহে চলমান ছবির প্রদর্শনী করতেন। দর্শকদের কাছে এটি ছিল যেন বিজ্ঞান ও জাদুর এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন। কেউ বিশ্বাসই করতে পারতেন না যে পর্দার মানুষ আসলে জীবন্ত নয়। সেই সময় সংবাদপত্রেও বায়োস্কোপ নিয়ে বিস্ময় ও কৌতূহলের নানা বিবরণ প্রকাশিত হতে শুরু করে।

এই নতুন শিল্পমাধ্যমের ইতিহাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম হীরালাল সেন। বাংলা তো বটেই, ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে তাঁর নাম আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। ১৮৯৮ সালে তিনি বিদেশি বায়োস্কোপ প্রদর্শনের কাজে যুক্ত হন এবং পরে প্রতিষ্ঠা করেন ‘রয়্যাল বায়োস্কোপ কোম্পানি’। কিন্তু শুধু প্রদর্শনেই থেমে থাকেননি। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, ক্যামেরা কেবল বিদেশি দৃশ্য দেখানোর যন্ত্র নয়; এটি ভারতীয় গল্প, সংস্কৃতি ও নাট্যজগতকে নতুনভাবে তুলে ধরার মাধ্যমও হতে পারে।

হীরালাল সেন কলকাতার জনপ্রিয় নাটকগুলির বিভিন্ন দৃশ্য চিত্রায়িত করতে শুরু করেন। ‘আলিবাবা’, ‘ভ্রমর’, ‘হরিরাজ’ প্রভৃতি নাটকের অংশ তিনি চলচ্চিত্রে ধারণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়। এমনকি বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অগ্রদূত। অনেক গবেষকের মতে, ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাণের কৃতিত্বও তাঁর প্রাপ্য।

সেই সময়ের কলকাতায় সিনেমা হলের ধারণা আজকের মতো ছিল না। স্টার থিয়েটার, মিনার্ভা থিয়েটার কিংবা ক্লাসিক থিয়েটারের মতো নাট্যগৃহেই বায়োস্কোপ প্রদর্শিত হত। ধীরে ধীরে দর্শকের আগ্রহ বাড়তে থাকে। বিশ শতকের গোড়ায় তৈরি হতে শুরু করে স্থায়ী সিনেমা প্রদর্শনের ব্যবস্থা। নতুন এক বিনোদন মাধ্যম দ্রুত জায়গা করে নেয় শহুরে জীবনে।

তবে এই ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক বেদনাদায়ক অধ্যায়ও। ১৯১৭ সালে আগুনে পুড়ে যায় হীরালাল সেনের সংরক্ষিত অধিকাংশ ফিল্ম, নেগেটিভ এবং নথিপত্র। ফলে ভারতীয় চলচ্চিত্রের এক অমূল্য ভাণ্ডার চিরতরে হারিয়ে যায়। আজ তাঁর নির্মিত কোনও পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্রের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। ইতিহাসবিদদের মতে, সেই সংগ্রহ বেঁচে থাকলে ভারতীয় সিনেমার শুরুর দিনের আরও বিস্তৃত চিত্র আমাদের সামনে থাকত।

আজ টালিগঞ্জকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের বিশাল পরিকাঠামো। কিন্তু সেই ইতিহাসের শিকড় খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় উনিশ শতকের শেষের কলকাতায়, যখন একদল মানুষ বিস্মিত চোখে প্রথমবার পর্দায় নড়তে থাকা ছবি দেখেছিলেন। তাঁরা হয়তো জানতেন না, সেই মুহূর্তেই জন্ম নিচ্ছে এমন এক শিল্প, যা আগামী শতাব্দীগুলিতে কোটি কোটি মানুষের কল্পনা, আবেগ ও সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করবে।

কলকাতার সেই প্রথম বায়োস্কোপ প্রদর্শনী তাই কেবল প্রযুক্তির আগমন নয়, ভারতীয় সিনেমার প্রথম স্বপ্ন দেখার গল্পও। আর সেই স্বপ্নের অন্যতম স্থপতি ছিলেন হীরালাল সেন—যাঁর ক্যামেরায় ধরা পড়েছিল ভারতীয় চলচ্চিত্রের শৈশব।