কলকাতা: এক সময় বাংলার রাজনীতিতে প্রতিবাদের চেনা ছবি ছিল কালো পতাকা। একটু বেশি ক্ষোভ হলে জুতো। আর চরম অসন্তোষ প্রকাশ করতে কালি মাখানোর ঘটনাও নতুন ছিল না। কিন্তু সময় বদলেছে। রাজনৈতিক প্রতিবাদের ভাষাও বদলেছে। এখন সেই সব পুরনো অস্ত্রকে অনেকটাই পিছনে ফেলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে এক নতুন প্রতীক— ডিম!

হ্যাঁ, সেই ডিম, যা একদিকে মধ্যবিত্তের রান্নাঘরের অপরিহার্য খাদ্য, অন্যদিকে এখন বাংলার রাজনৈতিক অভিধানে নতুন এক অধ্যায়ের নাম। রাজনৈতিক মহলের কেউ কেউ মজা করে এর নাম দিয়েছেন ‘ডিম থেরাপি’। কারণ এই থেরাপির রোগী সাধারণত নেতারাই!

বিধানসভা নির্বাচনে পালাবদলের পর থেকেই রাজ্যের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি নতুন শব্দের প্রচলন শুরু হয়— ‘এগ অ্যাটাক’। বিরোধিতার ভাষা যেন নতুন ব্যাকরণ খুঁজে পায়। আর সেই ব্যাকরণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যতিচিহ্ন হয়ে ওঠে একটি ডিম।

শুরুটা হয়েছিল ভোটের ফল ঘোষণার দিন। ব্যারাকপুরে পরাজিত তৃণমূল প্রার্থী ও চলচ্চিত্র পরিচালক রাজ চক্রবর্তীর দিকে ছোড়া হয়েছিল কাদা। তখন ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ বলছে, সেটাই ছিল ভবিষ্যতের এক নতুন রাজনৈতিক ট্রেন্ডের ইঙ্গিত।

তারপর একে একে তালিকায় নাম উঠতে থাকে তৃণমূলের প্রথম সারির নেতাদের। প্রথম বড় আলোচনার কেন্দ্রে আসেন সৌগত রায়। দমদমের সাংসদের দিকে ছোড়া ডিম কার্যত নতুন যুগের ট্রেলার হয়ে ওঠে। এরপর সোনারপুরে জনসংযোগ কর্মসূচিতে গিয়ে একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই ঘটনার ভিডিও মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে। লক্ষ লক্ষ মানুষ তা দেখেন, শেয়ার করেন, মন্তব্য করেন। যেন প্রতিবাদের এক নতুন দৃশ্যমান ভাষা তৈরি হয়ে যায়।

এরপর তালিকা আরও দীর্ঘ হয়েছে। বিধাননগরের প্রাক্তন মেয়র ও তৃণমূল নেতা সব্যসাচী দত্ত থেকে কুণাল ঘোষ,  ‘ডিম-রাজনীতি’র শিকার হয়েছেন। 

মজার বিষয়, ডিমের গণতন্ত্র বেশ বিস্তৃত। সে শুধু রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বিভিন্ন ক্ষেত্রে অভিযুক্তদের আদালতে তোলার সময় পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে পুলিশের গায়েও উড়ে এসেছে ডিম। ফলে এই নতুন রাজনৈতিক মৌসুমে কার্যত কেউই পুরোপুরি নিরাপদ নন।

কিন্তু প্রশ্ন হল, হঠাৎ ডিমই কেন?
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ বলছেন, এর পিছনে রয়েছে গভীর মনস্তত্ত্ব। পাথর ছোড়া মানে সরাসরি হামলা। লাঠি মানে হিংসা। কালি মাখানো আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে। কিন্তু ডিম এক অদ্ভুত মধ্যবর্তী অবস্থানে দাঁড়িয়ে থাকে। এতে সাধারণত বড় ধরনের শারীরিক ক্ষতির আশঙ্কা কম। অথচ অপমানের অভিঘাত অনেক বেশি।

একজন নেতা হয়তো এক ঘণ্টা ধরে ভাষণ দিলেন। নিজেদের সাফল্য তুলে ধরলেন। বিরোধীদের সমালোচনা করলেন। কিন্তু আচমকা একটি ডিম এসে পড়ল তাঁর গায়ে। পরদিন সংবাদপত্রে সেই দীর্ঘ ভাষণ নয়, শিরোনাম হয়ে যায় সেই একটি ডিম। রাজনৈতিক বার্তা হারিয়ে যায়, ডিম জিতে যায়।

সেই কারণেই হয়তো প্রতিবাদের বাজারে ডিমের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। রাজনৈতিক ভাষায় বলতে গেলে, এটি একেবারে ‘লো-কস্ট, হাই-ইমপ্যাক্ট’ অস্ত্র। খরচ সামান্য, কিন্তু প্রচার বিপুল। কয়েক টাকার একটি ডিম মুহূর্তে জাতীয় সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়ে উঠতে পারে। সামাজিক মাধ্যমে পৌঁছে যেতে পারে কয়েক লক্ষ মানুষের কাছে। প্রতিবাদকারীরাও জানেন, ডিমের আঘাতে হাড় ভাঙবে না, কিন্তু রাজনৈতিক অস্বস্তি তৈরি হবেই।

তবে এই প্রবণতার অন্য একটি দিকও রয়েছে। গণতন্ত্রে প্রতিবাদের অধিকার অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে বস্তু নিক্ষেপ কি প্রতিবাদের গ্রহণযোগ্য ভাষা হতে পারে? আজ ডিম, কাল অন্য কিছু— সেই আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। রাজনৈতিক সংস্কৃতির ক্রমাবনতি এবং অসহিষ্ণুতার অভিযোগও তুলছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।

তর্ক-বিতর্ক চলতেই পারে। কেউ একে জনরোষের প্রতীক বলবেন, কেউ রাজনৈতিক অসভ্যতার নিদর্শন। কিন্তু বাস্তব হল, বাংলার রাজনীতিতে ডিম এখন আর শুধুমাত্র খাদ্য নয়। এটি প্রতিবাদের প্রতীক, রাজনৈতিক বার্তার বাহক, কখনও ব্যঙ্গের অস্ত্র, কখনও ক্ষোভের প্রকাশ।

আর সেই কারণেই আজকাল আদালত চত্বর হোক বা সাংবাদিক বৈঠক— নিরাপত্তারক্ষীদের নজর শুধু স্লোগানধারীদের দিকে থাকে না। তাঁদের চোখ থাকে আরেকটি জিনিসের দিকে। কারও হাতে কোনও ডিম আছে কি না!

কারণ বর্তমান বাংলার রাজনীতিতে একটি ডিম কখন যে হাজার শিরোনাম লিখে ফেলবে, তা কেউই আগে থেকে বলতে পারে না।