২০২৬-এর বিশ্বকাপ যেন আফ্রিকান ফুটবলের উত্থানের এক মঞ্চ হয়ে উঠেছে। কৃষ্ণাঙ্গদের কাছে বারবার আটকে যাচ্ছে ইউরোপীয়দের দম্ভ। এর একটা টাটকা নিদর্শন দেখা গেল গতরাতেই, যখন দ্বিতীয় ম্যাচেই ধাক্কা খেল ইংরেজরা। প্রথম ম্যাচে ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে চার গোলের দুরন্ত জয়ের পর ঘানার বিরুদ্ধে গোলশূন্য ড্র করে মাঠ ছাড়তে হল হ্যারি কেনদের। ম্যাচের আগে ঘানার এক ওঝা দাবি করেছিলেন, তিনি নাকি কেনকে গোল করতে দেবেন না। সেই দাবি কতটা সত্যি, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। তবে বাস্তব বলছে, ইংল্যান্ডকে আটকে দেওয়ার আসল কৃতিত্ব ঘানার রক্ষণভাগ এবং গোলকিপার বেঞ্জামিন আসারের।
বিশ্বকাপের অন্যতম শক্তিশালী আক্রমণভাগকে থামিয়ে দিয়ে রাতারাতি আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন ৩৩ বছর বয়সি এই গোলরক্ষক। আরও আশ্চর্যের বিষয়, তিনি ইউরোপের কোনও নামী ক্লাবে খেলেন না। খেলেন ঘানার ঘরোয়া ক্লাব ‘হার্টস অফ ওক’-এ। যে দেশের শীর্ষ লিগে ন্যূনতম মাসিক বেতন মাত্র ১,৫০০ ঘানিয়ান সেডি, ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১২ হাজার টাকা। আসলে ঘানার ফুটবলের অর্থনৈতিক বাস্তবতা বেজায় কঠিন। গত বছর দেশটির ফুটবল ফেডারেশন নিয়ম করে দেয়, প্রিমিয়ার লিগের কোনও ফুটবলারকে মাসে অন্তত ১,৫০০ সেডি বেতন দিতে হবে। সেই অর্থে বিশ্বের বড় ফুটবল দেশগুলোর তুলনায় ঘানার ফুটবল অবকাঠামো এখনও অনেক পিছিয়ে। কিন্তু সেই দেশেরই এক ফুটবলার বিশ্বকাপের মঞ্চে ইংল্যান্ডের মতো শক্তিশালী দলকে গোলশূন্য রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেন।
আসারের গল্পটা আরও বেশি অনুপ্রেরণার। তিনি ঘানার প্রথম পছন্দের গোলকিপার নন। দলের নিয়মিত গোলরক্ষক লরেন্স আতি জিগি চোট পাওয়ায় সুযোগ আসে তাঁর সামনে। আর সেই সুযোগই তিনি দুই হাতে লুফে নিলেন। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে একের পর এক আক্রমণ সামলে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করেন তিনি। জুড বেলিংহ্যাম, হ্যারি কেনদের হতাশ করে ম্যাচের অন্যতম সেরা পারফরমার হয়ে ওঠেন এই অভিজ্ঞ গোলকিপার। তবে আসারের গুরুত্ব শুধু মাঠের পারফরম্যান্সে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর উপস্থিতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ঘানার ফুটবলের ভবিষ্যৎও। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, কোনও ক্লাবের ফুটবলার বিশ্বকাপে অংশ নিলে সেই ক্লাবকে প্রতিদিন নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ প্রদান করা হয়। ফলে আসারের মতো একজন ফুটবলারকে বিশ্বকাপ দলে রাখার অর্থ শুধুমাত্র গোলপোস্ট পাহারা দেওয়া নয়, বরং দেশের ফুটবল কাঠামোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সহায়তাও নিশ্চিত করা।
গ্রুপ পর্বেই তাঁর ক্লাব হার্টস অফ ওক বিপুল পরিমাণ অর্থ পাবে। আর ঘানার পরিকল্পনা অনুযায়ী, সেই অর্থের একটি বড় অংশ ব্যয় করা হবে যুব ফুটবলের উন্নয়নে। অর্থাৎ আসারে শুধু জাতীয় দলের জার্সিতে দায়িত্ব পালন করছেন না, পরোক্ষে দেশের ভবিষ্যৎ ফুটবলারদের পথও তৈরি করছেন। অবশ্য ঘানার শক্তি শুধু আসারে নন। দলে রয়েছেন ইউরোপের বিভিন্ন লিগে খেলা একাধিক তারকা ফুটবলার। আক্রমণে আন্তন সেমেনিও, মাঝমাঠে থমাস পার্টে, সামনে ইনাকি উইলিয়ামসের মতো ফুটবলাররা রয়েছেন। কিন্তু ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচে সবচেয়ে উজ্জ্বল নামটি নিঃসন্দেহে বেঞ্জামিন আসারে। তিনি শুধু গোল বাঁচাননি। তিনি আশা বাঁচিয়েছেন। তিনি নিজের ক্লাবকে বাঁচিয়েছেন। আর হয়তো ঘানার ফুটবলের ভবিষ্যৎকেও নতুন করে স্বপ্ন দেখিয়েছেন।
একাহাতে ইংরেজদের রুখে দিলেন ১২ হাজারি গোলকিপার! ঘানার আসারের গল্প আপনার চোখে জল এনে দেবে