২৪ জুন দিনটা ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এখন শুধু ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়, এই দিনটায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে একটাই আবেগ, সেটা হল লিওনেল মেসি। প্রতি চার বছর অন্তর বিশ্বকাপের মঞ্চে এই দিনটি যেন আরও বিশেষ হয়ে ওঠে। কারণ এদিনই বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর আরাধ্য নায়কের জন্মদিন। মার্কিন মুলুকে এবার ৩৯ বছরে পা দিলেন মেসি। আর তাঁর জন্মদিন ঘিরে উন্মাদনা এবার যেন ছাপিয়ে যাচ্ছে অতীতের সব রেকর্ড। কলকাতার গাঙ্গুলিবাগান থেকে গ্যাংটক, বুয়েনোস আইরেস থেকে গুয়াতেমালা— পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা তাঁর ভক্তরা নিজেদের মতো করে পালন করছেন ‘মেসি দিবস’।

তবে শুধু জন্মদিন নয়, এ বারের উদ্‌যাপনের পিছনে রয়েছে আরও এক বিশেষ কারণ। বয়স যখন ৩৯, তখন অধিকাংশ ফুটবলার অবসরের পথে হাঁটেন। কেউ কোচিংয়ে যান, কেউ টেলিভিশনের স্টুডিওতে বসে বিশ্লেষণ করেন খেলা। আর সেই বয়সেই মেসি বিশ্বকাপের মঞ্চে একের পর এক রেকর্ড ভেঙে চলেছেন। অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচে গোল করে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসেছেন তিনি। তবে সেই রেকর্ডের আলোয় ঢাকা পড়ে গিয়েছে আরও একাধিক কীর্তি। বিশ্বকাপের ছয়টি আসরে অংশ নিয়ে পাঁচটি আসরে গোল করার বিরল নজির এখন তাঁর দখলে। বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি বার ম্যাচসেরার পুরস্কার জয়ের রেকর্ডও তাঁর। সবচেয়ে বেশি বয়সে একটি বিশ্বকাপে পাঁচ গোল করার নজিরও গড়েছেন তিনি। অধিনায়ক হিসেবে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার এবং সবচেয়ে বেশি গোল করার রেকর্ডও আরও সমৃদ্ধ হয়েছে ডালাসের মাঠে। পাশাপাশি বিশ্বকাপে সর্বাধিক অ্যাসিস্টের তালিকাতেও এখন শীর্ষে রয়েছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। মজার বিষয় হল, এই সব রেকর্ডের অনেকগুলিই এসেছে ডালাসে। সেই ডালাস, যার সঙ্গে আর্জেন্টাইন ফুটবলের এক বেদনাদায়ক স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে ডোপিং-কাণ্ডে নির্বাসিত হয়েছিলেন দিয়েগো মারাদোনা। তিন দশকেরও বেশি সময় পরে সেই শহরই যেন আজ আর্জেন্টিনার আর এক কিংবদন্তিকে সম্মানের আসনে বসিয়েছে।

এখন প্রশ্ন হল, এবারের জন্মদিন কীভাবে পালন করবেন মেসি? আর্জেন্টিনা ইতিমধ্যেই নকআউট পর্ব নিশ্চিত করেছে। তবে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচ এখনও বাকি। জর্ডানের বিরুদ্ধে সেই ম্যাচও ডালাসেই। ফলে জন্মদিনের রাত কাটবে ডালাসের হোটেলে নাকি দলের বেস ক্যাম্পে, তা এখনও নিশ্চিত নয়। তবে আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী বারবিকিউ ‘আসাডো’ সহযোগে বিশেষ ডিনারের আয়োজন যে হবে, তা প্রায় নিশ্চিত। আর সেই আয়োজনের নেপথ্যে রয়েছেন মেসির অন্যতম ঘনিষ্ঠ সতীর্থ রদ্রিগো ডি’পল। মেসির বিশ্বকাপ যাত্রার সঙ্গে তাঁর জন্মদিনের সম্পর্কও বেশ আবেগঘন। ব্রাজিল, রাশিয়া, কাতার এবং এবার আমেরিকা— একাধিক বিশ্বকাপের মঞ্চে জন্মদিন পালন করেছেন তিনি। রাশিয়া বিশ্বকাপের সময় দলের পারফরম্যান্স এবং অস্থির পরিবেশের কারণে জন্মদিনের আবহ ছিল অনেকটাই নিস্তেজ। এমনকি স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জোও সেবার শিবিরে উপস্থিত ছিলেন না। কিন্তু এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। দল ছন্দে রয়েছে, অধিনায়কও রয়েছেন দুর্দান্ত ফর্মে। ফলে আয়োজন যে মেগা হবে, তাতে কোনও সন্দেহই নেই।

৩৯ বছর বয়সেও তিনি রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়ছেন। হয়তো ভবিষ্যতে তাঁর বহু কীর্তিই ভেঙে যাবে। কারণ রেকর্ড তৈরি হয় ভাঙার জন্যই। কিন্তু ইতিহাস সবসময় শুধু সংখ্যাকে মনে রাখে না। ইতিহাস মনে রাখে সেই মানুষদের, যারা নিজেদের সময়কে অতিক্রম করে কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন। আর সেই কারণেই ২৪ জুন শুধু লিওনেল মেসির জন্মদিন নয়। এটি এক ফুটবল যুগের উদ্‌যাপন।