সমালোচনা তাঁদের চিরসঙ্গী। ব্যর্থ হলেই উঠেছে প্রশ্ন। কখনও বলা হয়েছে ‘ফুরিয়ে গিয়েছেন’, কখনও ‘সময় শেষ’। কিন্তু প্রতিবারই তাঁরা প্রমাণ করেছেন, মহান খেলোয়াড়দের পরিচয় শুধু প্রতিভায় নয়, মানসিক দৃঢ়তা এবং পরিশ্রমেও। একজন ফুটবলের ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো, অন্যজন ক্রিকেটের বিরাট কোহলি। দুই ভিন্ন খেলার দুই কিংবদন্তি এবার এমন এক নজির গড়েছেন, যা ভবিষ্যতে ভাঙা প্রায় অসম্ভব বলেই মনে করছেন ক্রীড়াপ্রেমীরা।

বিশ্বকাপের মঞ্চে মঙ্গলবার নতুন ইতিহাস লিখেছেন রোনাল্ডো। উজবেকিস্তানের বিরুদ্ধে জোড়া গোল করে তিনি হয়ে উঠেছেন বিশ্বের প্রথম ফুটবলার, যিনি টানা ছয়টি বিশ্বকাপে গোল করার কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। ২০০৬ সালে জার্মানিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে শুরু হয়েছিল তাঁর বিশ্বকাপ অভিযান। ইরানের বিরুদ্ধে সেই প্রথম গোল। তারপর ২০১০, ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২২— প্রতিটি বিশ্বকাপেই গোলের দেখা পেয়েছেন তিনি।

তবে এর পর একসময় বিশ্বকাপ ও ইউরোর মতো বড় মঞ্চে গোলের খরা দেখা দিয়েছিল। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমালোচনাও বেড়েছিল। অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, বড় টুর্নামেন্টে রোনাল্ডোর প্রভাব শেষ হয়ে এসেছে। কিন্তু উজবেকিস্তানের বিরুদ্ধে জোড়া গোল করে সেই সব সমালোচনার জবাব দিলেন পর্তুগিজ মহাতারকা। ৪১ বছর বয়সেও তিনি বুঝিয়ে দিলেন, তাঁর ক্ষুধা এখনও অমলিন।

অন্যদিকে ক্রিকেটে একইরকম ধারাবাহিকতার প্রতীক বিরাট কোহলি। টি-২০ বিশ্বকাপের ইতিহাসে তিনিও গড়েছেন এক অনন্য রেকর্ড। ২০১২ থেকে ২০২৪— টানা ছয়টি টি-২০ বিশ্বকাপে খেলেছেন ভারতের এই ব্যাটিং তারকা। আর প্রতিটি বিশ্বকাপেই অন্তত একটি করে অর্ধশতরান করেছেন। 

বিশ্বকাপের মঞ্চে বিরাটের ধারাবাহিকতা সত্যিই বিস্ময়কর। ২০১২ সালে প্রথম টি-২০ বিশ্বকাপে পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে হাফসেঞ্চুরি দিয়ে শুরু। এরপর ২০১৪ সালে চারটি, ২০১৬ সালে তিনটি, ২০২১ সালে একটি এবং ২০২২ সালে চারটি অর্ধশতরান করেন তিনি। সব মিলিয়ে টি-২০ বিশ্বকাপে ৩৫টি ম্যাচে ১৫টি হাফসেঞ্চুরি করেছেন কোহলি।

তবে শুধু রান নয়, বড় মঞ্চে দলের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়ার ক্ষমতাই তাঁকে আলাদা করে দিয়েছে। দীর্ঘদিন বিশ্বকাপ খেলেও ট্রফি জেতার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। কিন্তু ২০২৪ সালের টি-২০ বিশ্বকাপ ফাইনালে যখন ভারতীয় দলের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল, তখনই ব্যাট হাতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন তিনি। ৭৬ রানের ম্যাচজয়ী ইনিংসে ভর করে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় ভারত। আর সেই ট্রফি জয়ের পরই টি-২০ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানান কোহলি।

রোনাল্ডো এবং কোহলির মধ্যে খেলার ধরন আলাদা, দেশের জার্সি আলাদা, খেলার মঞ্চও আলাদা। কিন্তু তাঁদের যাত্রাপথে রয়েছে এক অদ্ভুত মিল। দু’জনকেই বারবার নিজেদের প্রমাণ করতে হয়েছে। দু’জনকেই সমালোচনার আগুনে পুড়তে হয়েছে। আর দু’জনই প্রত্যাবর্তনকে শিল্পে পরিণত করেছেন। এই কারণেই তাঁদের রেকর্ড শুধু সংখ্যার গল্প নয়। এটি মানসিক শক্তি, অধ্যবসায় এবং দীর্ঘদিন শীর্ষে থাকার অসাধারণ ক্ষমতার গল্প। ভবিষ্যতে হয়তো আরও অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড় আসবেন, নতুন নতুন রেকর্ডও তৈরি হবে। কিন্তু টানা ছয়টি বিশ্বকাপ জুড়ে এমন ধারাবাহিকতার নজির যে কতটা কঠিন, তা সময়ই সবচেয়ে ভালোভাবে বুঝিয়ে দেবে।