ঋণের পাহাড় বনাম প্রত্যাশার বাজেট! টিম শুভেন্দুর প্রথম অর্থনৈতিক পরীক্ষার দিন সোমবার
ভাতা থেকে কর্মসংস্থান, অনুদান থেকে শিল্প! বাংলার নতুন অর্থনৈতিক দর্শনের রূপরেখা কি মিলবে বাজেটে?
কলকাতা: রাজনৈতিক পালাবদলের পরে বাংলার প্রশাসনিক মানচিত্র যেমন বদলেছে, তেমনই বদলেছে অর্থনৈতিক প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুও । গত এক দশকের বেশি সময় ধরে রাজ্যের অর্থনীতি ঘিরে যে প্রশ্নগুলি বারবার ফিরে এসেছে- ঋণের বোঝা, শিল্প বিনিয়োগের ঘাটতি, কর্মসংস্থানের সংকট, কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত! সেগুলির উত্তর খুঁজতে এখন নজর ২২ জুনের দিকে।
সোমবার বিধানসভায় ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করবেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। বিজেপি সরকারের ক্ষমতায় আসার পর এটাই প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট। ফলে এটি নিছক আয়-ব্যয়ের হিসাবপত্র নয়, বরং নতুন সরকারের অর্থনৈতিক দর্শনের প্রথম বড় রাজনৈতিক দলিল বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
ঋণের পাহাড়ের নীচে দাঁড়িয়ে
নবান্নের নতুন বাসিন্দাদের সামনে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা রাজ্যের আর্থিক স্বাস্থ্য। কয়েক লক্ষ কোটি টাকার ঋণের বোঝা, প্রতি বছর বিপুল সুদ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা এবং সীমিত রাজস্ব বৃদ্ধির সুযোগ! এই ত্রিমুখী চাপে দাঁড়িয়ে অর্থমন্ত্রীকে বাজেটের ভারসাম্য খুঁজে নিতে হবে।
প্রশাসনিক সূত্রের ইঙ্গিত, বাজেটে আগামী কয়েক বছরের জন্য ঋণ নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক ঘাটতি কমানোর একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তুলে ধরা হতে পারে। পুরনো উচ্চ সুদের ঋণ পুনর্গঠন, অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় সংকোচন এবং আর্থিক শৃঙ্খলার উপর বিশেষ জোর দেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
কর নয়, নজর রাজস্বে
নতুন সরকারের সামনে রাজনৈতিক ভাবেও একটি সূক্ষ্ম সমীকরণ রয়েছে। ভোটের পরপরই সাধারণ মানুষের উপর নতুন করের বোঝা চাপানো ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে কর বাড়ানোর বদলে রাজস্ব আদায়ের নতুন পথ খোঁজাই হতে পারে বাজেটের অন্যতম কৌশল।
খনিজ সম্পদের ই-নিলাম, সরকারি জমির দীর্ঘমেয়াদি লিজ, প্রযুক্তিনির্ভর কর প্রশাসন এবং জিএসটি ফাঁকি রোধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার- এমন একাধিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত ইতিমধ্যেই মিলেছে প্রশাসনিক মহলে। লক্ষ্য একটাই, করের হার না বাড়িয়ে রাজ্যের আয় বাড়ানো।
শিল্পে কি ফিরবে, বাংলার বাজি?
বিজেপির নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান। ফলে প্রথম বাজেটেই সেই প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন দেখতে চায় শিল্পমহল।
সূত্রের খবর, শিল্প বিনিয়োগের জন্য ‘সিঙ্গেল উইন্ডো’ ব্যবস্থা, দ্রুত জমি বরাদ্দ এবং অনুমোদনের জটিলতা কমানোর রূপরেখা ঘোষণা হতে পারে। কলকাতা, দুর্গাপুর-আসানসোল, হলদিয়া এবং শিলিগুড়িকে ঘিরে চারটি পৃথক অর্থনৈতিক বৃদ্ধিক্ষেত্র তৈরির পরিকল্পনাও আলোচনায় রয়েছে।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই বাজেটের অন্যতম বার্তা হতে পারে, ‘সরকারি ভাতা নয়, স্থায়ী কর্মসংস্থান’।
ক্ষুদ্র শিল্প ও কৃষির উপর ভরসা
শুধু বড় শিল্প নয়, বাংলার অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকেও গুরুত্ব দিতে পারে সরকার। তাঁত, রেশম, কারুশিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ কিংবা ইঞ্জিনিয়ারিং- জেলার বিশেষ শিল্পভিত্তিক ক্লাস্টার গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
একই সঙ্গে কৃষি ক্ষেত্রেও পরিকাঠামো উন্নয়নের উপর জোর থাকতে পারে। বিশেষ করে কোল্ড স্টোরেজ ও সরবরাহ শৃঙ্খলা গড়ে তোলার মাধ্যমে কৃষিপণ্যের অপচয় কমানোর উদ্যোগের সম্ভাবনা রয়েছে।
কেন্দ্রের প্রকল্পে নতুন গতি?
পালাবদলের পর দিল্লি ও কলকাতার সম্পর্কের সমীকরণও বদলেছে। সেই প্রেক্ষাপটে দীর্ঘদিন আটকে থাকা বিভিন্ন কেন্দ্রীয় প্রকল্পে রাজ্যের অংশীদারি ব্যয় বাড়ানোর ঘোষণা আসতে পারে।
গ্রামীণ রাস্তা, আবাসন, পানীয় জল, সীমান্ত অবকাঠামো এবং শহুরে নিকাশি ব্যবস্থার উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য মূলধনী ব্যয়ের (ক্যাপেক্স) সম্ভাবনা নিয়ে ইতিমধ্যেই জল্পনা শুরু হয়েছে প্রশাসনিক মহলে।
উত্তরবঙ্গ কি পাবে আলাদা গুরুত্ব?
নতুন সরকারের রাজনৈতিক সাফল্যে উত্তরবঙ্গের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বাজেটে উত্তরবঙ্গের জন্য পৃথক অর্থনৈতিক প্যাকেজের সম্ভাবনা নিয়ে জোর আলোচনা চলছে।
পর্যটন, জল প্রকল্প, লজিস্টিক হাব এবং সীমান্ত বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে উত্তরবঙ্গকে নতুন অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার রূপরেখা সামনে আসতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সমাজকল্যাণে ছাঁকনি
সবচেয়ে বেশি নজর থাকবে সমাজকল্যাণ খাতের দিকে। নতুন সরকারের ‘অন্নপূর্ণা’ প্রকল্প ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে।
তবে একই সঙ্গে আর্থিক অপচয় রুখতে উপভোক্তাদের তালিকা পুনর্বিন্যাস, আয়ের ভিত্তিতে যোগ্যতা নির্ধারণ এবং ভুয়ো সুবিধাভোগীদের বাদ দেওয়ার মতো পদক্ষেপও ঘোষণা হতে পারে। অর্থাৎ সামাজিক সুরক্ষা থাকবে, কিন্তু তার সঙ্গে থাকবে আর্থিক শৃঙ্খলার বার্তাও।
আসল পরীক্ষা সোমবার
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মানুষের প্রত্যাশা অনেক। কিন্তু প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার ফারাকও কম নয়। এক দিকে ঋণের পাহাড়, অন্য দিকে কর্মসংস্থান তৈরির চাপ। এক দিকে সামাজিক প্রকল্প, অন্য দিকে শিল্প বিনিয়োগের প্রয়োজন।
সোমবারের বাজেট সেই দ্বৈত চ্যালেঞ্জেরই প্রথম উত্তরপত্র। সেদিক থেকে, শুভেন্দু সরকারের কাছে এটি কেবল একটি বাজেট নয়, বাংলার অর্থনীতিকে কোন পথে নিয়ে যেতে চায় নতুন সরকার, তার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ঘোষণা।
এখন দেখার, বাজেটে টিম শুভেন্দু কতটা আস্থা জাগাতে পারে বাংলার বাজার, শিল্পমহল এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে।