ওয়াশিংটন ও তেহরানের কূটনৈতিক সমঝোতার ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করল আন্তর্জাতিক বাণিজ্য তথা ভারতের আমদানিতে। গত ১৭ জুন আমেরিকা এবং ইরানের মধ্যে ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকে এখনও পর্যন্ত ভারতমুখী অন্তত ১১টি পণ্যবাহী জাহাজ হরমুজ় প্রণালী অতিক্রম করেছে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিকের দিকে এগোলেও এখনও সম্পূর্ণ স্বস্তি মেলেনি। পারস্য উপসাগরে হরমুজ় প্রণালী পার হওয়ার জন্য এখনও অপেক্ষায় দিন গুনছে আরও ২৬টি ভারতমুখী জাহাজ।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের যৌথ বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই-এর মৃত্যুর পর মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র যুদ্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এর জেরেই গত ১১ মার্চ থেকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ় প্রণালীতে ‘অবরোধ’ জারি করে ইরান। তেহরানের তরফে কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল, কোনও জাহাজ এই জলপথ অতিক্রম করার চেষ্টা করলেই তার ওপর হামলা চালানো হবে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অচলাবস্থা তৈরি হয় এবং হরমুজ়ের উভয় প্রান্তে শয়ে শয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ আটকে পড়ে।

তবে এই চরম উত্তেজনার মধ্যেও নয়াদিল্লির সঙ্গে সুপ্রাচীন কূটনৈতিক সম্পর্কের খাতিরে ভারতকে বিশেষ ছাড় দিয়েছিল তেহরান। গত ১১ মার্চ প্রথম ভারতমুখী একটি জাহাজ ১ লক্ষ টনেরও বেশি অশোধিত জ্বালানি তেল নিয়ে হরমুজ় পার হয়ে নিরাপদে ভারতীয় বন্দরে পৌঁছায়। জাহাজ মন্ত্রক সূত্রে খবর, গত ১ মার্চ থেকে ১৭ জুনের মধ্যে ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া ১৯টি জাহাজ নিরাপদে এই প্রণালী পার হতে পেরেছিল। আর ১৭ জুন আমেরিকা-ইরান মউ স্বাক্ষরের পর গত কয়েকদিনে পার হয়েছে আরও ১১টি জাহাজ। অর্থাৎ, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখনও পর্যন্ত মোট ৩০টি ভারতমুখী জাহাজ হরমুজ়ের বাধা টপকাতে পেরেছে।

মন্ত্রক সূত্রে জানা গেছে, হরমুজ় পেরিয়ে ভারতের উদ্দেশ্যে আসা এই ৩০টি জাহাজের মধ্যে ১৭টিই ছিল অন্য দেশের পতাকাবাহী। ইতিমধ্যে ভারতের বন্দরে পৌঁছানো বা ভারতের পথে থাকা এই জাহাজগুলির প্রায় অর্ধেক অংশই নিয়ে আসছে এলপিজি (LPG) এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG)। অন্যদিকে, যে ২৬টি জাহাজ এখনও পারস্য উপসাগরে অপেক্ষায় রয়েছে, তার মধ্যে ৩টিতে রয়েছে জ্বালানি এবং ১০টিতে রয়েছে ভারতের কৃষিক্ষেত্রের জন্য অত্যন্ত জরুরি রাসায়নিক সার। বাকি ১৩টি জাহাজে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পণ্য রয়েছে।

আমেরিকা ও ইরানের এই সমঝোতার পর গত কয়েক দিনে হরমুজ় প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজের আনাগোনা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও, তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে পরিস্থিতি এখনই পুরোপুরি যুদ্ধ-পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরছে না। তবে জলপথে যে কোনও ধরণের অনভিপ্রেত সংঘাত বা 'ভুল বোঝাবুঝি' এড়াতে একটি বিশেষ ‘টেলিফোন হটলাইন’ চালু করতে সম্মত হয়েছে ইরান। আমেরিকা বা অন্য কোনও দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ এই জলপথ দিয়ে যাওয়ার সময় কোনও রকম সমস্যার সম্মুখীন হলে বা সমন্বয়ের প্রয়োজন হলে সরাসরি এই হটলাইনে যোগাযোগ করতে পারবে।

নয়াদিল্লির কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক মহল মনে করছে, এই হটলাইন ব্যবস্থা এবং দুই দেশের সাম্প্রতিক মউ-এর ফলে আগামী দিনে ভারতের জ্বালানি ও সার আমদানির অনিশ্চয়তা অনেকটাই কেটে যাবে।