কলকাতা: কলকাতার আকাশে বৃহস্পতিবার দুপুরে আচমকাই নেমে এল অন্ধকার। কালো মেঘে ঢেকে গেল শহর। তার পর শুরু হল ঘনঘন বজ্রপাত, ঝোড়ো হাওয়া আর প্রবল বৃষ্টি। কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় লাল সতর্কতা জারি করেছে আবহাওয়া দফতর। শহরের বহু এলাকা জলমগ্ন, ব্যাহত যান চলাচল। তারাতলার উদ্ধারকাজেও প্রভাব ফেলেছে বৃষ্টি। কিন্তু এই দুর্যোগের মাঝেই আরও একটি প্রশ্ন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে কেন এত বেড়ে গিয়েছে বজ্রপাত?
মাত্র দু’দিন আগেই, মঙ্গলবারের ভয়াবহ ঝড়বৃষ্টিতে পশ্চিমবঙ্গে বজ্রাঘাতে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ১০ জনের। কোচবিহারে দু’জন, মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ানে চার জন-সহ বিভিন্ন জেলায় প্রাণ গিয়েছে বহু মানুষের। এমন ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়। বরং প্রতি বর্ষা মৌসুমেই বজ্রপাত যেন বাংলার এক নীরব ঘাতকে পরিণত হয়েছে।
আবহাওয়াবিদ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, এর নেপথ্যে রয়েছে একাধিক কারণ। তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল বিশ্ব উষ্ণায়ন এবং জলবায়ুর দ্রুত পরিবর্তন। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা যত বাড়ছে, বায়ুমণ্ডলে তত বেশি জলীয় বাষ্প জমা হচ্ছে। উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ু দ্রুত উপরে উঠে বিশালাকার কিউমুলোনিম্বাস মেঘ তৈরি করছে। এই মেঘের মধ্যেই তৈরি হয় বৈদ্যুতিক চার্জের তীব্র অসমতা। তার ফলই বজ্রপাত।
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, এক ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধি বজ্রপাতের সম্ভাবনা প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে। গত এক দশকে বঙ্গোপসাগরের পৃষ্ঠতলের তাপমাত্রাও ধারাবাহিক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে দক্ষিণবঙ্গে বর্ষার আগে এবং বর্ষার শুরুতে বজ্রগর্ভ মেঘ তৈরির প্রবণতা অনেক বেড়েছে।
ভারতের আবহাওয়া গবেষণা সংস্থা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সমীক্ষার তথ্য বলছে, পূর্ব ভারত তথা গঙ্গা অববাহিকা বজ্রপাতের অন্যতম ‘হটস্পট’-এ পরিণত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা এবং অসমে বজ্রপাতের সংখ্যা গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিশেষ করে কৃষিজমি, খোলা মাঠ, নদী ও জলাভূমি সংলগ্ন এলাকায় ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
শুধু জলবায়ু পরিবর্তনই নয়, নগরায়ণও এই পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করছে। বড় বড় কংক্রিটের কাঠামো এবং দূষণের কারণে শহরের উপরিভাগের বায়ুমণ্ডলে অস্বাভাবিক তাপমাত্রার পার্থক্য তৈরি হচ্ছে। এর ফলে বজ্রগর্ভ মেঘের সৃষ্টি আরও ত্বরান্বিত হতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার দক্ষিণবঙ্গের প্রায় সব জেলাতেই হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির সঙ্গে ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার কয়েকটি অংশে ৫০ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে ঝড়ের সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী কয়েক দিনও ঝড়বৃষ্টির দাপট অব্যাহত থাকতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বজ্রপাতকে শুধুমাত্র প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি এখন জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম দৃশ্যমান সতর্কবার্তা। প্রতি বছর ভারতে শত শত মানুষের মৃত্যু হয় বজ্রাঘাতে। অথচ সচেতনতা বাড়ালে অনেক প্রাণ বাঁচানো সম্ভব। বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠ, জলাশয়, গাছের নীচে বা উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে থাকা বিপজ্জনক। মোবাইল বা বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ব্যবহারও এড়ানো উচিত।
আকাশে বিদ্যুতের ঝলকানি বরাবরই প্রকৃতির এক বিস্ময়। কিন্তু সেই বিস্ময় এখন ক্রমশ আতঙ্কে পরিণত হচ্ছে। কলকাতার আকাশে বৃহস্পতিবারের কালো মেঘ যেন আবার মনে করিয়ে দিল— জলবায়ুর পরিবর্তন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, তা ইতিমধ্যেই আমাদের বর্তমান বাস্তবতা। আর তার সবচেয়ে ভয়ংকর বার্তাবাহকদের মধ্যে অন্যতম হয়ে উঠেছে এই বাড়তে থাকা বজ্রপাত।
বাড়ছে বজ্রপাত, বদলে যাওয়া জলবায়ুই কি সবচেয়ে বড় কারণ