বোলপুর: প্রায় এক শতাব্দী আগে যে শহরে নিজের আঁকা ছবির সামনে দাঁড়িয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সেই মস্কোতেই ফের ফিরে এল তাঁর শিল্পের স্পর্শ। দীর্ঘ ৯৬ বছর পর রাশিয়ার রাজধানীতে শুরু হল বিশ্বকবির চিত্রপ্রদর্শনী। বিশ্বভারতীর রবীন্দ্রভবন সংগ্রহশালা থেকে বাছাই করা ৫৯টি দুর্লভ ও মূল্যবান চিত্র নিয়ে আয়োজিত হয়েছে এই প্রদর্শনী। নাম রাখা হয়েছে: ‘বিশ্ব একটি নীড়’।
মস্কোর সি-২ গ্যালারিতে আয়োজিত এই প্রদর্শনী শুধুমাত্র শিল্পপ্রেমীদের আকর্ষণের কেন্দ্র নয়, ভারত-রাশিয়া সাংস্কৃতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক বলে মনে করা হচ্ছে। বিশ্বভারতী, ন্যাশনাল গ্যালারি অব মডার্ন আর্ট এবং মস্কোয় ভারতীয় দূতাবাসের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই প্রদর্শনী চলবে আগামী ২৩ অগস্ট পর্যন্ত।
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক ছিল গভীর আবেগের। ১৯২৫ থেকে ১৯২৮ সালের মধ্যে একাধিক বার আমন্ত্রণ এলেও নানা কারণে রাশিয়া যাওয়া হয়নি তাঁর। অবশেষে ১৯৩০ সালে সেই স্বপ্নপূরণ হয়। সেই সফরেই মস্কোয় তাঁর আঁকা ছবির প্রদর্শনী হয়েছিল। তারপর কেটে গিয়েছে প্রায় এক শতাব্দী। সংরক্ষণের স্বার্থে বিদেশে আর পাঠানো হয়নি এই অমূল্য শিল্পকর্মগুলি। অবশেষে আবার মস্কোর শিল্পমঞ্চে জায়গা পেল বিশ্বকবির তুলির সৃষ্টি।
প্রদর্শনীর নামের মধ্যেও রয়েছে বিশ্বভারতীর আদর্শ। ‘যত্র বিশ্বং ভবত্যেকনীড়ম্’, বিশ্বভারতীর এই মূলমন্ত্র থেকেই এসেছে ‘বিশ্ব একটি নীড়’ নামটি। বিভাজনের সময়ে ঐক্যের বার্তা, সংঘাতের সময়ে মানবতার আহ্বান- যেন সেই দর্শনই তুলে ধরছে প্রদর্শনী।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বভারতীর উপাচার্য প্রবীর কুমার ঘোষ। প্রদর্শনীতে রবীন্দ্রনাথের শিল্পভাবনার বিভিন্ন পর্যায়ের কাজ স্থান পেয়েছে। পাশাপাশি ভারত ও রাশিয়ার একাধিক শিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এই উদ্যোগে সহযোগিতা করছে।
সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথকে বিশ্ব চিনেছে বহু আগে। কিন্তু জীবনের শেষ পর্বে তিনি আবিষ্কার করেছিলেন আর এক নিজস্ব ভাষা- ছবির ভাষা। ১৯২৪ সালের পর থেকে চিত্রসৃষ্টিতে মনোনিবেশ করেন তিনি। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত প্রায় দুই হাজারেরও বেশি ছবি এঁকেছিলেন। তাঁর ছবিতে যেমন ধরা পড়ে মানবমুখ, পাখি, প্রাণী ও মুখোশের রহস্যময় জগৎ, তেমনই দেখা যায় লোকশিল্প, আদিম শিল্প ও পাশ্চাত্য নন্দনতত্ত্বের অনন্য মেলবন্ধন।
আজ যখন বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের আবহ, তখন মস্কোয় রবীন্দ্রনাথের এই প্রত্যাবর্তন যেন নতুন এক বার্তা বহন করছে। প্রায় একশো বছর আগে যে শিল্পী লিখেছিলেন, “রাশিয়া না এলে এ জন্মে তীর্থদর্শন অসম্পূর্ণ থেকে যেত”, তাঁর শিল্পই আজ দুই দেশের সাংস্কৃতিক বন্ধনের নতুন সেতু হয়ে উঠেছে।
শতবর্ষের ব্যবধান পেরিয়ে মস্কোয় আবারও প্রমাণিত হল, রাষ্ট্রের সীমানা বদলাতে পারে, কিন্তু শিল্পের ভাষা চিরকাল বিশ্বজনীন।
রাষ্ট্রের সীমানা বদলাতে পারে, কিন্তু শিল্পের ভাষা চিরকাল বিশ্বজনীন