কলকাতার ধর্মতলার প্রাণকেন্দ্রে, গ্র্যান্ড হোটেল থেকে একেবারে হাঁটা দূরত্বেই রয়েছে এক শতাব্দীপ্রাচীন দর্জির দোকান—‘বরকত আলি অ্যান্ড ব্রাদার্স’। এই দোকানটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলা সিনেমার ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। কারণ এখান থেকেই স্যুট বানাতেন উত্তম কুমার। শুধু বানাতেনই না, কাপড়ের মান, কাটের নিখুঁততা, ফিটিংস—সবকিছুর উপরে নিজস্ব নজর রাখতেন মহানায়ক নিজেই।
উত্তম কুমার ছিলেন পরিপাটি পোষাকপ্রেমী। শুটিংয়ের পোশাক হোক বা ব্যক্তিগত ব্যবহারের জামাকাপড়, তিনি কখনওই আপোষ করতেন না ফিটিংসের সঙ্গে। তাঁর পোশাকে চাই ছিল নিখুঁততা—গলা, কাঁধ, হাতা বা ঝুল, সবটাই হতেই হবে একেবারে পারফেক্ট। শোনা যায়, সিনেমার দৃশ্যের আগেও দর্জিকে আলাদাভাবে ডেকে এনে ট্রায়াল দিতেন তিনি। ‘নায়ক’ ছবিতে সত্যজিৎ রায়ের ক্যামেরায় ধরা পড়া যেই স্মরণীয় স্যুটটি, সেটিও এই দোকানেই তৈরি।
১৯১০ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘বরকত আলি অ্যান্ড ব্রাদার্স’ শুধু উত্তম কুমারের নয়, বরং একাধিক খ্যাতিমান রাজনৈতিক নেতা, খেলোয়াড় এবং বিশিষ্টজনের বিশ্বস্ত পোষাক প্রস্তুতকারক। সেই সময় থেকে আজও এই দোকান এক ঐতিহ্য বহন করে চলেছে নিখুঁত কাট আর ক্লাসিক ফ্যাশনের ধারা। উত্তম কুমার এখানে শুধু স্যুট নয়, বানাতেন শার্টও। হাজার ব্যস্ততা সত্ত্বেও, তিনি নিজেই দোকানে হাজির হতেন কাপড় বাছতে ও কাটের আদেশ দিতে।
এই দোকানের আসল পরিচয় তার ‘কাট’। ‘বরকত আলির কাট’ ছিল একপ্রকার ব্র্যান্ড। এই কাস্টম কাটিংয়ের খ্যাতি এতটাই ছড়িয়েছিল যে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও মানুষ আসতেন এখানকার দর্জিদের হাতে তৈরি স্যুট বানাতে। সময় বদলেছে, পোষাকের ধারা বদলেছে, কিন্তু ধর্মতলার এই ছোট্ট দোকানটি এখনও সেই ঐতিহ্য ও গর্ব বহন করে চলেছে।
আজ যখন বিয়ের মরসুমে কেউ মহানায়কের মতো রুচিশীল ফ্যাশনের কথা ভাবেন, তখন ধর্মতলার এই দোকানটি হয়ে ওঠে এক অনন্য গন্তব্য। ফ্যাশনের দুনিয়ায় ট্রেন্ড আসবে যাবে, কিন্তু উত্তম কুমারের মতো নিখুঁত শৈলী এবং ‘বরকত আলি অ্যান্ড ব্রাদার্স’-এর মতো দক্ষতা—এগুলি রয়ে যাবে চিরকালীন অনুপ্রেরণা হয়ে।
