দিব্যেন্দু মজুমদার, হুগলি
বহু ইতিহাসের সাক্ষী শেওড়াফুলি রাজবাড়িতে আজ থেকে প্রায় ৩০০ বছর আগে মা সর্বমঙ্গলার স্বপ্নাদেশ পেয়ে মনোহর রায় দুর্গাপুজোর প্রচলন করেছিলেন। মায়ের আদেশ অনুসারে মনোহর রায় বর্ধমানের আঁটিসারা গ্রাম থেকে মায়ের অষ্টধাতুর মূর্তি উদ্ধার করে শেওড়াফুলি রাজবাড়িতে প্রতিষ্ঠা করেন। তারপর থেকে প্রায় ৩০০ বছর ধরে এই পুজো এলাকার মানুষের মন জুড়ে রয়েছে। বর্ধমানের অগ্রদ্বীপ পাটুলির দত্ত পরিবার একসময় রায় উপাধি লাভ করেন। এই পরিবারেরই বংশধর হলেন মনোহর রায়। পাটুলিতে এক সময় এই পরিবারের দুটি বিশাল রাজপ্রাসাদ ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে গঙ্গার ভয়াবহ ভাঙনে ওই রাজপ্রাসাদ দুটি গঙ্গাবক্ষে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। তখনকার দিনে এই রায় পরিবারের শেওড়াফুলিতে একটি বাড়ি ছিল যা কাছারি বাড়ি নামে পরিচিত ছিল। এই রায় পরিবারের হাওড়া, হুগলি, নদিয়া, বর্ধমান জেলায় জমিদারি ছিল। তখন শেওড়াফুলির এই কাছারি বাড়ি থেকে জমিদারির সমস্ত কাজকর্ম পরিচালনা করা হত।
নদীগর্ভে পাটুলির দুটি রাজপ্রাসাদ বিলীন হয়ে যাওয়ার পর রায় পরিবারের সদস্যরা এই কাছারি বাড়িতে এসে বসবাস শুরু করেন। কাছারি বাড়িতে বাস করাকালীন একদিন রাতে মনোহর রায় মা সর্বমঙ্গলার আদেশ পেয়ে বর্ধমানের আঁটিসারা গ্রাম থেকে মায়ের অষ্টধাতুর মূর্তি উদ্ধার করে তা শেওড়াফুলিতে এনে পুজোর প্রচলন করেন। তখনকার দিনে এই রায় পরিবার সমাজের সমস্ত শ্রেণির মানুষের শিক্ষার অগ্রগতির জন্য কাছারি বাড়ির একটা অংশ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য দান করেন যা আজ সুরেন্দ্রনাথ বিদ্যানিকেতন নামে পরিচিত। ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায়, ১৭৫২ সালে শ্রীরামপুর উপনিবেশ ডেনমার্কের শাসনাধীন ছিল। সেই সময় ড্যানিশরা এই রাজ পরিবারকে যথাযথ সম্মান ও স্বীকৃতি দিয়ে তাদের কর প্রদান করতেন। ১৮৪৫ সালে শেওড়াফুলি রাজ পরিবার ও ড্যানিশ সরকারের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং সেই চুক্তি অনুযায়ী শেওড়াফুলি রাজ পরিবারকে বার্ষিক ১৬০১ সিক্কা প্রদান করা হত।
পরিবারের পক্ষ থেকে আশিসবাবু জানান, মাকে এই পরিবারে দেবী কাত্যায়নী রূপে আরাধনা করা হয়। দশভুজা মা এখানে সিংহের উপর অধিষ্ঠান করেন। এখানে মায়ের বাহন সিংহের গলার আকৃতি অনেকটা ঘোড়ার মতো। তবে অন্যান্য দুর্গাপুজোর ন্যায় এখানে মায়ের সঙ্গে তার সন্তান লক্ষ্মী, গণেশ, কার্তিক, সরস্বতী বিরাজ করেন না। রীতি অনুযায়ী কৃষ্ণপক্ষের নবমীতে মায়ের বোধন হয়। আর বোধনের দিন পরিবারের কেউ অন্নভোগ গ্রহণ করেন না। আজও সেই রীতিকে মান্যতা দিয়ে এই বিশেষ দিনটিতে পরিবারের সকলে লুচি, ফল, মিষ্টি ও ইলিশ মাছ খেয়ে থাকেন। বোধনের পর থেকেই শুরু হয়ে যায় চণ্ডীপাঠ। সেই চণ্ডীপাঠ চলে দশমী পর্যন্ত। এক সময় এই পরিবারের পুজোয় পাঁঠা বলির রেওয়াজ থাকলেও পরবর্তীকালে তা বন্ধ হয়ে যায়। জানা যায় এই পরিবারের এক বংশধর রাতে স্বপ্নে দেখেন বলির জন্য আনা পাঁঠা মা মা করে চিৎকার করছে। স্বপ্নে এই দৃশ্য দেখার পর রীতিমতো ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে তার মন। দেখেন পাঁঠার আর্তনাদ শুনে মা সর্বমঙ্গলা পর্যন্ত উল্টোদিকে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন অর্থাৎ মাও চাইছেন না তার সন্তানদের এভাবে বলি দেওয়া হোক।
এরপর থেকে শেওড়াফুলি রাজ পরিবারে চিরকালের জন্য পাঁঠাবলি বন্ধ হয়ে যায়। এই পুজোয় নবমীর দিন পরিবারের সধবা মহিলাদের মধ্যে যিনি বয়োঃজ্যেষ্ঠ, তিনি পরিবারের অন্য সধবা মহিলাদের সিঁদুর পরিয়ে দেন। এই পুজোয় দশমীর বৈশিষ্ট্য হল অপরাজিতা পুজোর পর অপরাজিতার লতাপাতা দিয়ে তৈরি করা আংটি পরিবারের পুরুষরা পরেন। দশমীর সন্ধ্যায় ঘট বিসর্জনের মধ্যে দিয়ে এই পুজোর সমাপ্তি হয়। বিসর্জনের পরের দিন থেকে ফের রীতি মেনে শুরু হয়ে যায় মায়ের নিত্য পুজো।
