
ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া হুশিয়ারি এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার জোড়া ফলায় বড়সড় ধাক্কা খেল ভারত-ইরান দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য। মার্কিন রোষানল থেকে বাঁচতে আপাতত ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যে ‘ধীরে চলো’ নীতি নিয়েছে নয়াদিল্লি। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের রফতানি খাতে। বর্তমানে গুজরাটের কান্দালা ও মুন্দ্রা বন্দরে ইরানে পাঠানোর জন্য মজুত করা প্রায় ২,০০০ কোটি টাকার পণ্য আটকে রয়েছে।
সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়েছেন, যে সমস্ত দেশ ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাবে, তাদের ওপর ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক চাপানো হতে পারে। এই চরম অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে ভারত সরকার ও রফতানিকারকরা আপাতত পিছু হঠার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিশেষ করে সমুদ্রপথে আরব সাগর হয়ে যে পণ্য ইরানে পৌঁছাত, তা এখন বন্দরেই পড়ে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ভারত থেকে ইরানে রফতানি হওয়া পণ্যের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে বাসমতি চাল, চা, ওষুধ এবং বিভিন্ন কৃষিজ সামগ্রী। ইরান হলো ভারতীয় বাসমতি চালের বৃহত্তম ক্রেতা, যারা প্রতি বছর প্রায় ১২ লক্ষ টন চাল আমদানি করে। যার বাজারমূল্য প্রায় ১২,০০০ কোটি টাকা।
রফতানি স্থগিত হওয়ায় দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে বাসমতি চালের চাহিদা হঠাৎ কমে গেছে। রাইস এক্সপোর্টার্স ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট প্রেম গর্গ জানিয়েছেন, রফতানিকারকরা নতুন কোনো চুক্তি করতে ভয় পাচ্ছেন। ফলে দেশের খোলা বাজারে চালের দাম কমতে শুরু করেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের বড় লোকসানের মুখে ফেলতে পারে।
ভারত ও ইরানের বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৪০০ কোটি ডলার। কেবল ব্যবসাই নয়, কৌশলগত কারণেও ইরান ভারতের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত চাবাহার বন্দর ভারতের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যা মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের যোগাযোগের প্রধান পথ। বর্তমান রাজনৈতিক টানাপোড়েনে এই বন্দরের নিয়ন্ত্রণ এবং ভারতের বিনিয়োগ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
বাণিজ্যিক সমস্যার পাশাপাশি ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও অত্যন্ত জটিল। গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদ এখন ধর্মীয় শাসন বিরোধী গণআন্দোলনের রূপ নিয়েছে। তেহরানসহ একাধিক শহরে ছড়িয়ে পড়া এই বিক্ষোভে প্রশাসনের কড়া পদক্ষেপে এ পর্যন্ত প্রায় ৩,০০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দাবি করছে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ এবং ইরানের অস্থিতিশীলতা—এই দুইয়ের জাঁতাকলে পড়ে ভারত এখন কার্যত উভয়সংকটে। একদিকে মার্কিন শুল্কের ভয়, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক বন্ধুকে হারানো। নয়াদিল্লি এখন পরিস্থিতির ওপর সতর্ক নজর রাখছে, কারণ এই অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে ভারতের অর্থনীতি ও কৌশলগত অবস্থানে তার গভীর প্রভাব পড়বে।।
