
শীতের সকাল মানেই জানলার ফাঁক দিয়ে আসা হিমেল বাতাস আর মনে জমে থাকা একরাশ ভ্রমণের তৃষ্ণা। কলকাতার ব্যস্ততা, ট্র্যাফিক জ্যাম আর যান্ত্রিকতা যখন দমবন্ধ করে তোলে, তখন মুক্তি খুঁজতে খুব দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। মাত্র কয়েক ঘণ্টার পথ পেরোলেই অপেক্ষায় আছে লাল মাটির দেশ পুরুলিয়া। যেখানে পাহাড় আর জলের মেলবন্ধন এক শান্ত, মায়াবী পৃথিবীর গল্প শোনায়।
বড়ন্তি: যেখানে লেকের জলে নীল দিগন্ত মেশে
পুরুলিয়ার রঘুনাথপুর মহকুমার ছোট্ট গ্রাম বড়ন্তি। সরকারি খাতায় এর নাম রামজীবনপুর হলেও পর্যটকদের কাছে এ এক স্বর্গরাজ্য। শীতের ভোরে বড়ন্তি লেকের ধারে দাঁড়ালে দেখা যায় কুয়াশার চাদর সরিয়ে জেগে উঠছে পাহাড়। সূর্যোদয়ের প্রথম আলো যখন লেকের স্থির জলে পড়ে, তখন মুহূর্তেই জলের রঙ নীল থেকে সোনালি হয়ে যায়। একপাশে পঞ্চকোট আর অন্যপাশে বিহারীনাথ পাহাড়কে সাক্ষী রেখে বড়ন্তি যেন এক জীবন্ত ক্যানভাস। বিকেলে লেকের পাড়ে বসে এক কাপ গরম চা আর সূর্যাস্তের সাক্ষী হওয়া—এই অভিজ্ঞতা যে কোনো দামী রিসোর্টের বিলাসিতাকে হার মানায়। বড়ন্তি মানেই নিঃশ্বাস নেওয়ার অফুরন্ত আকাশ।
বড়ন্তি থেকে একটু ভেতরে ঢুকলেই আদিবাসী গ্রামগুলোর সহজ-সরল জীবন। মাটির বাড়ির দেওয়ালে হাতের কাজের আলপনা আর উঠোনে রোদে দেওয়া ধান—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। শীতের রাতে যখন গ্রামে ধামসা-মাদল বেজে ওঠে, তখন আগুনের চারপাশে গোল হয়ে বসে লোকগান শোনা বা শালপাতায় পোড়া মাংসের স্বাদ নেওয়ার আনন্দই আলাদা। টুসু বা বাঁধনা পরবের সময় এলে তো কথাই নেই, গোটা গ্রাম মেতে ওঠে উৎসবে। এদের আতিথেয়তায় কোনো কৃত্রিমতা নেই, আছে পাহাড়ের মতোই এক বিশাল উদারতা।
বড়ন্তি থেকে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লে হাতের নাগালেই মিলবে একের পর এক বিস্ময়। অযোধ্যা পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে লুকিয়ে আছে মার্বেল লেক, যার স্বচ্ছ নীল জল দেখে মনে হবে আপনি হয়তো ভিনদেশে চলে এসেছেন। বামনী ফলসের ঝর্নার শব্দ আর খয়েরবেরা ড্যামের নির্জনতা মনকে এক নিমেষে শান্ত করে দেয়। আবার ‘হীরক রাজার দেশে’র স্মৃতি জড়ানো জয়চণ্ডী পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে চারপাশটা দেখলে মনে হয় পৃথিবীটা কত সুন্দর। যাঁদের হাতে সময় একটু বেশি, তাঁরা চাইলেই ঢুঁ মারতে পারেন গড় পঞ্চকোটের ধ্বংসাবশেষে, যেখানে ইতিহাস কথা বলে। মাইথন বা পাঞ্চেত ড্যামের বিশাল জলরাশি আর পাহাড়ের মিতালিও আপনাকে নিরাশ করবে না।
বসন্তে পলাশের আগুন ঝরা রূপ আর বর্ষার সজীবতা বড়ন্তিকে আলাদা পরিচিতি দিলেও, শীতের বড়ন্তি এক একান্ত ব্যক্তিগত অনুভবের নাম। এখানে মহুয়ার গন্ধে নেশা লাগে না ঠিকই, কিন্তু হিমেল রাতে চাঁদের আলোয় শালবনের ঝিরঝিরে আওয়াজ এক অপার্থিব পরিবেশ তৈরি করে।পুরুলিয়া শুধু ঘোরার জায়গা নয়, এটি একটি অনুভূতি। শহরের কোলাহল ভুলে নিজেকে নতুন করে খুঁজে পাওয়ার ঠিকানা। তাই ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়ুন। পাহাড়, জঙ্গল আর জলের এই আহ্বান উপেক্ষা করা কঠিন। এই শীতে বড়ন্তি আর অযোধ্যা আপনাকে ডাকছে—আপনি তৈরি তো?
