
স্নিগ্ধা চৌধুরী: বৈশাখ মাসের শুক্লা পক্ষের রোহিণী নক্ষত্রসমন্বিত তৃতীয়া তিথি, সনাতন ধর্মে যাকে বলা হয় অক্ষয় তৃতীয়া, শাস্ত্র ও পুরাণে এটি এক অক্ষয়, অনন্ত ও অবিনাশী মহাতিথি হিসেবে কীর্তিত। এই দিবসকে ব্রহ্মাণ্ডের তত্ত্বে এমন এক পুণ্যক্ষেত্র বলা হয়েছে, যেখানে কৃত কর্মের ফল কখনও ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না, বরং তা কালচক্রে অনন্তগুণে প্রসারিত হয়।
পৌরাণিক আখ্যানে এই দিবস কেবল একটি উৎসব নয়, বরং সৃষ্টিলীলা, শক্তিতত্ত্ব ও দেবীয় আবির্ভাবের এক মহাসংগমস্থল।
এই দিবসে প্রথমেই স্মরণীয় হয়ে ওঠে আদ্যাশক্তি পার্বতীর ধূমাবতী রূপে আবির্ভাবের গুপ্ত তত্ত্ব। দেবীভাগবত ও তন্ত্রশাস্ত্রের বর্ণনায় দেখা যায়, যখন সৃষ্টিতে তামসিক শক্তির প্রবল প্রভাব বিস্তার করে, তখন দেবী পার্বতী স্বয়ং বৈরাগ্য, শূন্যতা ও ধ্বংসের তত্ত্ব ধারণ করে ধূমময়ী ধূমাবতী রূপে প্রকাশিত হন। এই রূপে তিনি কেবল দেবী নন, বরং তিনি কালশক্তির নিগূঢ় প্রকাশ, যিনি সৃষ্টির মোহভঙ্গ ঘটিয়ে সাধককে নির্বাণের পথে আহ্বান করেন। তাঁর এই রূপে ধ্বংস আসলে সংহারের নয়, বরং মহাশূন্যে আত্মসমর্পণের আধ্যাত্মিক দ্বার।
এরপর অক্ষয় তৃতীয়ার আরেক মহাপৌরাণিক অধ্যায় হলো মা অন্নপূর্ণার দিব্যপ্রকাশ। শিবতত্ত্ব ও শক্তিতত্ত্বের মিলনে এক সময় সৃষ্টি জগতে অন্নের অভাব দেখা দিলে, স্বয়ং মহেশ্বর ত্রিভুবনে ভিক্ষা করতে প্রবৃত্ত হন। সেই সময় কাশীধামে আদ্যাশক্তি পার্বতী অন্নপূর্ণা রূপে সিংহাসনাসীনা হয়ে অন্নব্রহ্মের প্রবাহ ধারণ করেন। তিনি করুণা ও তৃপ্তির অক্ষয় ভাণ্ডার উন্মুক্ত করে সমগ্র জগৎকে পোষণ করেন। এই ঘটনা কেবল পৌরাণিক নয়, বরং এটি অন্নই ব্রহ্ম, এই বেদান্তিক তত্ত্বের জীবন্ত প্রকাশ।
অক্ষয় তৃতীয়ার সঙ্গে যুক্ত আরেক মহাগাথা হলো ভাগীরথের তপস্যার ফলস্বরূপ গঙ্গার স্বর্গলোকে থেকে মর্ত্যে অবতরণ। ব্রহ্মার জটাজাল ভেদ করে যখন ভাগীরথীর ধারায় গঙ্গা পৃথিবীতে নেমে আসেন, তখন তা কেবল নদীর জন্ম নয়, বরং পাপবিনাশিনী মোক্ষদায়িনী গঙ্গাতত্ত্বের অবতারণা। শাস্ত্রে বলা হয়, গঙ্গার স্পর্শে শুধু দেহ নয়, আত্মাও শুদ্ধ হয়, এবং এই দিবসেই সেই দিব্যধারা মর্ত্যলোককে স্পর্শ করে।
তন্ত্র ও বৈষ্ণব পুরাণে এই তিথিতে সূচিত হয় চন্দন যাত্রা, যেখানে শ্রীজগন্নাথ দেবের দিব্য দেহ চন্দন ও জলতরঙ্গে শীতল করা হয়। এটি কেবল আচার নয়, বরং লীলা পুরুষোত্তমের শীতল-লীলার এক গূঢ় প্রকাশ, যেখানে দেবতা স্বয়ং ভক্তের প্রেমে দেহধারণ করেন।
এই পবিত্র তিথিকে আরও মহিমান্বিত করে তোলে পরশুরাম অবতারলীলার আবির্ভাব। ভগবান বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার রূপে পরশুরাম ধরাধামে অবতীর্ণ হয়ে ক্ষত্রিয় দম্ভের বিনাশ ও ধর্মসংস্থাপনের মহান দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ধৃত কুঠারধারী নয় কেবল, বরং তিনি ধর্মচক্রের সংহার-সংস্থাপন শক্তির প্রতীক।
পুরাণে আরও বলা হয়, এই অক্ষয় তৃতীয়ার দিব্যক্ষণে যুগচক্রের গতি পরিবর্তিত হয়, যেখানে এক মহাযুগের অবসান ও অন্য যুগের সূচনা ঘটে যা সময়ের সীমা অতিক্রম করে কালপুরুষের লীলারূপ প্রকাশ করে।
এইভাবে অক্ষয় তৃতীয়া কেবল একটি তিথি নয়, বরং এটি ব্রহ্মাণ্ডের শক্তিচক্র, দেবতাদের লীলা এবং মোক্ষতত্ত্বের এক অক্ষয় মহাগ্রন্থ, যেখানে সৃষ্টি, স্থিতি ও সংহারের তিন শক্তি এক বিন্দুতে মিলিত হয়ে মানব আত্মাকে অনন্তের দিকে আহ্বান করে।
