আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং রাজনৈতিক বিতর্কের জগতে কখনও কখনও ছোট ঘটনাও বড় প্রতিক্রিয়া ডেকে আনে। তেমনই একটি ঘটনা সম্প্রতি আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিটকে ঘিরে চীনের এক কূটনীতিক এমন মন্তব্য করেছেন, যা একদিকে যেমন হাস্যরসের খোরাক জুগিয়েছে, অন্যদিকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নতুন করে উত্তাপ এনেছে।
চীনের ইন্দোনেশিয়ার ডেনপাসারে নিযুক্ত কনসাল জেনারেল ঝাং ঝিশেং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি পোস্ট করেন, যেখানে তিনি দাবি করেন, চীনবিরোধী বক্তব্য রাখার সময় হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট চীনে তৈরি পোশাক পরে ছিলেন। তিনি স্পষ্ট করে লেখেন, “চীনের বিরুদ্ধে দোষারোপ করা তাঁদের পেশা, কিন্তু জীবনের জন্য চীনা পণ্যের উপর নির্ভরশীলতা বজায় রাখাই বাস্তবতা।”
ঝাং লেভিটের একটি ছবি পোস্ট করে বলেন, ওই ছবিতে যে পোশাক লেভিট পরেছেন, সেটির লেইস চীনের মাবু শহরের এক পোশাক কারখানায় তৈরি হয়েছে। এই দাবির সূত্র অনুযায়ী, পোশাকটির নির্মাণ কাজ করেছেন চীনা এক নারী শ্রমিক, যিনি নিজেই সোশ্যাল মিডিয়ায় সেটি শনাক্ত করেন। ঝাং সেই মন্তব্যও উদ্ধৃত করেন এবং ব্যঙ্গাত্মকভাবে বলেন, “চীনের বিরুদ্ধে বলার আগে তাঁরা যেন অন্তত গায়ে কী পরেছেন তা ভালো করে দেখে নেন।”
এই মন্তব্যের পর চীনা সোশ্যাল মিডিয়াগুলোতে ঝড় বয়ে যায়। অনেকে লেভিটকে ভণ্ড, কৃত্রিম রাজনীতিবিদ বলে সমালোচনা করেন। কারও কারও মতে, একজন চীনা পণ্যের ব্যবহারকারী হয়ে চীনের বিরুদ্ধে কথা বলা নীতিগত দ্বিচারিতা। চীনের জনপ্রিয় ওয়েইবো প্ল্যাটফর্মে অনেকেই মজা করে বলেন, “যারা চীনকে দোষ দেয়, তারাও শেষমেশ চীনেই পোশাকের জন্য ভরসা রাখে।”
তবে অন্যপক্ষেও প্রতিক্রিয়া আসে। কেউ কেউ এই পোস্টকে প্রোপাগান্ডা বলে চিহ্নিত করেন। তাদের মতে, ছবিতে লেভিট যেটি পরেছিলেন, সেটি একটি ইউরোপীয় ব্র্যান্ডের পোশাক, যা চীনা কারখানার তৈরি পোশাকের অনুকরণে তৈরি হয়েছে এমন দাবি ভিত্তিহীন। এই যুক্তি দেওয়া হয় যে, নকল বা অনুরূপ ডিজাইন পাওয়া মানেই আসল পোশাকটি চীনে তৈরি—এই ধারণা অতিরঞ্জিত।
এই বিতর্ক আবারও স্মরণ করিয়ে দেয় চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের একটি সূক্ষ্ম ও টানটান দিক। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, মানবাধিকার, ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার ইত্যাদি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা চলছে। একে অপরের বিরুদ্ধে বারবার বাকযুদ্ধে লিপ্ত হওয়া দুই রাষ্ট্রের মধ্যকার নতুন কিছু নয়। কিন্তু এই ঘটনার মধ্যে দিয়ে কূটনৈতিক মঞ্চে এক ধরনের ব্যঙ্গ এবং সামাজিক মিডিয়াকে ব্যবহার করে চিত্র নির্মাণের প্রবণতাও সামনে আসে।
চীনের তথাকথিত “ওলফ ওয়ারিয়র” কূটনীতি বা আগ্রাসী কূটনৈতিক রীতি এই ঘটনার মধ্যেও প্রতিফলিত হয়েছে। যেখানে তাঁরা শুধু কূটনৈতিক ভাষায় নয়, বরং ব্যক্তিগত উদাহরণ টেনে এনে ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন। এটি চীনের সাম্প্রতিক বৈদেশিক নীতির একটি পরিচিত কৌশল।
এই সমগ্র ঘটনায় যদিও বিশ্বরাজনীতিতে কোনও মৌলিক পরিবর্তন আসেনি, তবু এটি প্রমাণ করে যে, এখনকার কূটনীতি শুধু কনভেনশনাল বৈঠক আর চুক্তিতেই সীমাবদ্ধ নয়—সামাজিক মাধ্যমের প্রতিক্রিয়া, ছবি, ব্যঙ্গ ও প্রতিক্রিয়াও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এই রকম আরও অনেক স্নায়ুযুদ্ধ ধাঁচের বিতর্ক ভবিষ্যতেও দেখা যাবে বলেই আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের অভিমত।
শেষ পর্যন্ত ক্যারোলিন লেভিট এই মন্তব্যের কোনও উত্তর দেননি, তবে হোয়াইট হাউসের তরফে এ নিয়ে সরকারি প্রতিক্রিয়াও আসেনি। তা সত্ত্বেও এই ঘটনাটি একটি আলাদা মাত্রায় সামাজিক ও কূটনৈতিক আলোচনার সৃষ্টি করেছে—যেখানে পোশাক হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক বার্তার বাহক।
