ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের উত্তাপ যখন তুঙ্গে, সেই সময় এক ব্যতিক্রমী বার্তা উঠে এল পাকিস্তানের বালোচিস্তান প্রদেশ থেকে। জঙ্গি হামলা, সীমান্তে উত্তেজনা, সেনা অভিযান—সব মিলিয়ে উপমহাদেশে যখন যুদ্ধের আবহ, তখন বালোচ জনজাতি জানিয়ে দিল, পাকিস্তানের হিন্দুদের রক্ষায় তারাই ঢাল হয়ে দাঁড়াবে। পাকিস্তানের ভিতরেই জন্ম নিচ্ছে এক ‘প্রতিরোধ’, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন লেখক ও বালোচ মুক্তি আন্দোলনের কর্মী মীর ইয়ার বালোচ।
সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়া এক্স-এ মীর ইয়ার বালোচ ঘোষণা করেন, “বালোচিস্তানে বসবাসকারী হিন্দুদের আশ্বস্ত করছি—আপনাদের গায়ে আঁচড়ও লাগতে দেব না। পাকিস্তান সেনার সন্ত্রাস ও আগ্রাসন থেকে হিংলাজ মাতা মন্দির এবং হিন্দু সম্প্রদায়কে রক্ষা করতে আমরা রয়েছি। পাকিস্তানের কাপুরুষ সেনাকে এমন শিক্ষা দেব, যা তাদের সাত পুরুষ ভুলবে না।”
এই ঘোষণার তাৎপর্য অনেক। প্রথমত, এটি পাকিস্তানের সংখ্যালঘু হিন্দু জনগণের জন্য এক বিরল আশ্বাস, যেখানে বারবার নিপীড়নের শিকার হতে হয়েছে তাঁদের। দ্বিতীয়ত, এটি পাকিস্তান সেনার বিরুদ্ধে বালোচ জনজাতির এক স্পষ্ট প্রতিরোধের বার্তা—যা শুধু ধর্মীয় সুরক্ষার আড়ালে রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবিকেও জোরদার করে তোলে।
এই পরিস্থিতির পটভূমিতে রয়েছে পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলা। গত ২২ এপ্রিল কাশ্মীরের বৈসরনে পর্যটকদের টার্গেট করে হত্যা করে ‘দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’ (TRF), যাদের পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈবার শাখা বলে মনে করা হয়। ২৬ জন নিরীহ মানুষের প্রাণ যায়। ভারত পাকিস্তানের সরাসরি জঙ্গি মদতের অভিযোগ তোলে এবং ৭ মে ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর মাধ্যমে পাকিস্তান ও পাক অধিকৃত কাশ্মীরের ৯টি জঙ্গিঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালায়।
যদিও ভারত সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, কোনো সাধারণ নাগরিক বা পাকিস্তান সেনার পরিকাঠামোকে টার্গেট করা হয়নি। কিন্তু এরপরই পাকিস্তান সীমান্তে মরিয়া হয়ে ওঠে—বিনা প্ররোচনায় গোলাবর্ষণ, ড্রোন হামলা, মিসাইল উৎক্ষেপণ সবই হয়। ভারতীয় সেনা প্রতিটি হামলা প্রতিহত করে। বিদেশ সচিব বিক্রম মিস্রি জানান, “যদি পাকিস্তান ফের হামলা করে, তার উপযুক্ত জবাব আমরা দেব।”
এই উত্তেজনার আবহেই প্রশ্ন উঠতে থাকে—পাকিস্তান সেনা কি এবার নিজেদের দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর রোষ ঝাড়বে? বালোচিস্তানের হিন্দুরা কি আক্রান্ত হবেন? এমন ভয়াবহ সম্ভাবনার মধ্যেই হুঙ্কার দিয়ে ওঠে বালোচ জনগণ। তারা জানিয়ে দেয়—হিংলাজ মাতার আশীর্বাদে ও বালোচ চেতনায় বলীয়ান হয়ে, তারা হিন্দুদের রক্ষা করতে বদ্ধপরিকর।
বালোচিস্তান বহুদিন ধরেই পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার দাবি জানিয়ে আসছে। বালোচ মুক্তি আন্দোলন বারবার পাকিস্তান সেনার মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। এই আন্দোলন এবার ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের রক্ষার প্রতীকী দায়ও নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছে। শুধু রাজনৈতিক নয়, নৈতিক শক্তির জায়গা থেকেও তারা পাকিস্তান রাষ্ট্রের সামনে দাঁড়াতে চায়।
এই ঘটনা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সংকটকে আরও প্রকট করে তুলছে। রাষ্ট্রশক্তি যখন দুর্বল, জনজাতিরাই তখন সত্যিকারের প্রতিরক্ষা বলয়ে রূপ নেয়। হিন্দুদের প্রতি বালোচদের এই সংহতি এবং পাকিস্তান সেনার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সংকল্প শুধু প্রতিবেশী ভারতের মন জিতছে না, বরং আন্তর্জাতিক মহলেও এক নতুন মানবিক বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে—অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো মানে ধর্ম নয়, ন্যায় আর বিবেক।
