চিনে গিয়ে ভারতের ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মহম্মদ ইউনূস। তাঁর মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে তৈরি হয় অস্থিরতা। ইউনূস বলেছিলেন, “ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চল ‘ল্যান্ড লকড’ বা স্থলবেষ্টিত। সেখানে সমুদ্র-সংযোগ একমাত্র বাংলাদেশই দিতে পারে। পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী। হিমন্ত বিশ্বশর্মা ম্যাপ তুলে ধরে জানিয়ে দেন, ‘বাংলাদেশেও দু’টি ‘চিকেন নেক’ রয়েছে, যা আরও বেশি ভঙ্গুর এবং সংবেদনশীল।’
মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তের এই বক্তব্যের পর বাংলাদেশের উত্তর এবং দক্ষিণে দু’টি সরু ভূখণ্ড বা করিডোর নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দুই করিডোর শুধু ভৌগোলিক ভাবেই নয়, কৌশলগত দিক থেকেও বাংলাদেশের কাছে বড় দুর্বলতা হয়ে দাঁড়াতে পারে। বাংলাদেশের উত্তরের করিডোরটি রংপুরকে দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করে রাখতে পারে। এই করিডোরটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং মেঘালয়ের মাঝে অবস্থিত প্রায় ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সরু ভূখণ্ড। এর সংকীর্ণতম অংশ দক্ষিণ দিনাজপুর এবং মেঘালয়ের পশ্চিম গারো হিলসের মাঝে। রংপুর বাংলাদেশের প্রথম সারির প্রশাসনিক বিভাগ। আয়তন প্রায় ১৬,০০০ বর্গকিলোমিটার এবং জনসংখ্যা ১ কোটি ৭৬ লক্ষের বেশি। এখানকার ৮৬.৫ শতাংশ মানুষ মুসলমান এবং প্রায় ১৩ শতাংশ হিন্দু। সামান্য রাজনৈতিক বা সামরিক অস্থিরতা তৈরি হলে এই করিডোর পুরো রংপুর অঞ্চলকে সে দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে আলাদা করে দিতে পারে।
দ্বিতীয় ‘চিকেন নেক’ হল চট্টগ্রাম করিডোর। দক্ষিণ ত্রিপুরা থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত মাত্র ২৮ কিলোমিটার লম্বা একটি করিডোর এটি। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিভাগকে দু’ভাগে ভাঙে চট্টগ্রাম করিডোর। উত্তর-পশ্চিম অংশ ব্রাহ্মণবেড়িয়া, কুমিল্লা, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালি এবং ফেনী জেলা। দক্ষিণ-পূর্বে চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান এবং কক্সবাজার। এই করিডোরটি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে স্থলপথে পৌঁছানো অসম্ভব। শুধুমাত্র সমুদ্রপথই তখন ভরসা। বাংলাদেশের জন্য এই ভৌগোলিক অবস্থান নিঃসন্দেহে অস্বস্তির।
হিমন্ত এক্স হ্যান্ডেলে পোস্ট করে বলেন, “ভারতের একটি ‘চিকেন নেক’ থাকলেও বাংলাদেশে রয়েছে দু’টি। এই দুই করিডোর অনেক বেশি সংবেদনশীল। যদি বাংলাদেশ ভারতের শিলিগুড়ি করিডোরকে টার্গেট করে, তবে ভারতও চট্টগ্রাম এবং রংপুর করিডোরের দিকে নজর দেবে।” তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের করিডোরগুলি ভারতের করিডোরের তুলনায় আরও সরু এবং ভৌগোলিকভাবে বেশি ভঙ্গুর। সামরিক বা রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় চিকেন নেক করিডোর একটি বড় ‘চোক পয়েন্ট’ হয়ে উঠতে পারে। ভারতের শিলিগুড়ি করিডোর ২২ কিলোমিটার চওড়া এবং তিন দিক থেকে তাকে সুরক্ষিত রাখছে ভারতীয় সেনা। তাই আপাত ভাবে ভারতের জন্য এটি তেমন কোনও দুর্বলতা নয়। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ওই দুটি করিডোরের সে রকম কোনও কৌশলগত প্রতিরক্ষা বলয় নেই। তাই, ইউনূসের বাংলাদেশের জন্য ওই দু’টি চিকেন নেক শুধু ভৌগোলিক ভাবে নয়, নিরাপত্তার দিক থেকেও বেশ অস্বস্তির।
