
সময় বহমান। সময় কারো জন্য থেমে থাকে না। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে ২০২৫ সাল এখন ইতিহাসের পাতায় নাম লেখাতে প্রস্তুত। ফেলে আসা দিনগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, এই একটা বছর ভারতকে দিয়েছে দু’হাত ভরে সাফল্য, আবার মাঝে মাঝে বিষণ্ণতার কালো মেঘও ঢেকেছে আকাশ। কিন্তু বাঙালির চিরাচরিত স্বভাব হলো ইতিবাচকতাকে পাথেয় করে এগিয়ে চলা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চেয়েছিলেন ভারত বিশ্বসভায় তার ‘শ্রেষ্ঠ আসন’ গ্রহণ করুক; ২০২৫ সাল যেন সেই লক্ষ্যেই ভারতের এক দৃপ্ত পদচারণা।
“ভারত আমার জগৎ সভার শ্রেষ্ঠ আসনও লবে “এই বছরে ভারত দেখিয়েছে যে আমরা হারতে শিখিনি, আমরা কেবল জিততে আর লড়তে জানি।
অর্থনীতির ব্যাটে ভারতের ‘সেঞ্চুরি’
২০২৫ সালের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি নিঃসন্দেহে ভারতের অর্থনৈতিক উত্থান। জাপানকে টপকে ভারত আজ বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি। ৪.১৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের এই বিশাল মাইলফলক কেবল পরিসংখ্যান নয়, এটি কোটি কোটি ভারতীয়র পরিশ্রমের ফসল। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) যখন ঘোষণা করে যে ভারত জার্মানির ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলছে, তখন প্রতিটি ভারতীয়র বুক গর্বে ভরে ওঠে। যদিও মাথাপিছু আয়ের নিরিখে জাপানের তুলনায় আমরা পিছিয়ে, তবুও বিশেষজ্ঞদের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী ২০২৭ সালের মধ্যে তৃতীয় স্থানে যাওয়ার স্বপ্ন এখন আর অলীক নয়। ডিজিটাল ইন্ডিয়ার ক্ষেত্রেও ইউপিআই (UPI) আজ বিশ্বসেরার তকমা পেয়েছে। স্মার্টফোনের একটি ক্লিকের মাধ্যমে গ্রাম থেকে শহর যে আর্থিক বিপ্লব ঘটিয়েছে, তা আজ বিদেশের মাটিতেও সমাদৃত।
মহাকাশ জয় ও কূটনৈতিক মুকুট
বিজ্ঞানের আঙিনায় ২০২৫ সাল ছিল গ্রুপ ক্যাপ্টেন শুভাংশু শুক্লার। দীর্ঘ ৪১ বছর পর রাকেশ শর্মার উত্তরসূরি হিসেবে কোনো ভারতীয় মহাকাশে ইতিহাস গড়লেন। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে তাঁর ১৮ দিনের সফর ভারতের মহাকাশ গবেষণাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ইসরোর ‘স্পেডেক্স’ মিশন ছিল এক বিস্ময়—মহাকাশে দুটি কৃত্রিম উপগ্রহের সেই ‘করমর্দন’ বা ডকিং সিস্টেম প্রমাণ করেছে যে মঙ্গলযান বা চন্দ্রযানের পর ভারত এখন মহাকাশ স্টেশনের পথেও সাবলীল। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মুকুটে যুক্ত হয়েছে ওমানের সর্বোচ্চ সম্মান ‘অর্ডার অফ ওমান’। ৩৪টি আন্তর্জাতিক পুরস্কারের মালিক হিসেবে তিনি বিশ্বমঞ্চে ভারতের কূটনীতিকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
খেলার মাঠ ও সংস্কৃতির জয়রথ
২০২৫ সাল ছিল ভারতের মেয়েদের। হরমনপ্রীত কৌরের নেতৃত্বে ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের বিশ্বকাপ জয় যেন এক রূপকথা। দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে মুম্বইয়ের মাঠে যখন তেরঙা উড়ল, তখন গোটা দেশ কেঁদেছিল আনন্দের অশ্রুতে। কেবল ক্রিকেট নয়, স্কোয়াশ থেকে খো খো বিশ্বকাপ—সবখানেই ছিল ভারতের দাপট। দাবার বোর্ডে ১৯ বছরের দিব্যা দেশমুখের বিশ্বজয় নতুন প্রজন্মের মেধার স্বাক্ষর।
সংস্কৃতির মঞ্চেও ভারত পিছিয়ে নেই। ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলার মেয়ে অনুপর্ণা রায়ের সেরা পরিচালকের খেতাব অর্জন বিশ্ব চলচ্চিত্রে ভারতের মুখ উজ্জ্বল করেছে। আবার কন্নড় লেখিকা বানু মুস্তাকের ‘বুকার প্রাইজ’ প্রাপ্তি মনে করিয়ে দিয়েছে যে ভারতের আঞ্চলিক সাহিত্য আসলে বিশ্বমানের।
অন্ধকার চিরে মানবতার আলো
কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। ভালো-মন্দের মিশেলেই তো জীবন। কাশ্মীরের বৈশ্বরণের সেই অমানবিক ও নরকীয় ঘটনা আমাদের হৃদয়কে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। ধর্মের দোহাই দিয়ে যে রক্তপাত, তা কোনো সুস্থ সমাজ মেনে নিতে পারে না। তবে সেই অন্ধকারের মাঝেও জ্বলে উঠেছিল ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর মনোবল। আমরা কাপুরুষের মতো ময়দান ছাড়িনি। প্রতিটি মানুষের মনে যে ক্ষোভ আর প্রতিবাদ দানা বেঁধেছিল, তা প্রমাণ করেছে যে ভারত বিভাজনের রাজনীতি নয়, বরং সংহতির শক্তিতে বিশ্বাস করে।
২০২৫ বিদায় নিচ্ছে, কিন্তু রেখে যাচ্ছে কিছু অমূল্য শিক্ষা। আমরা বুঝেছি, সাফল্য তখনই পূর্ণতা পায় যখন সেখানে হিংসা আর হানাহানির স্থান থাকে না। আজকের এই উন্নত ভারতের গতিরোধ করতে পারে একমাত্র ধর্মীয় বিদ্বেষ আর বিভাজনের রাজনীতি। তাই ২০২৬-এ পা রাখার আগে আমাদের অঙ্গীকার হোক—বন্ধ হোক হানাহানি, জয় হোক মানবতার। ভারতের প্রতিটি ধূলিকণা যেন সম্প্রীতির মন্ত্রে দীক্ষিত হয়। দেশের জয় মানে তো আসলে আপনার, আমার, আমাদের সবার জয়। হার না মানা মানসিকতা নিয়ে আমরা আরও এক নতুন বছরের দিকে এগিয়ে যাব, যেখানে কেবল উন্নতি আর ভালোবাসার গল্প লেখা থাকবে।।
