
রুডইয়ার্ড কিপলিং-এর ‘দ্য জঙ্গল বুক’-এর সেই মোগলির দেশ আজ এক ভয়ঙ্কর বাস্তবতার মুখোমুখি। মধ্যপ্রদেশের যে অরণ্য একসময় ব্যাঘ্র সংরক্ষণের সাফল্যের কাহিনি শোনাত, আজ তা পরিণত হয়েছে এক রণক্ষেত্রে। বাঘের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা আর সংকুচিত হতে থাকা বনাঞ্চলের জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে মানুষ ও বন্যপ্রাণ— দুই পক্ষই।
গত ১৩ দিনে পেন্স টাইগার রিজার্ভ ও তার আশেপাশে বাঘের হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন দুই ব্যক্তি। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গ্রামবাসীদের ক্ষোভ আছড়ে পড়েছে বন দফতরের ওপর। সর্বশেষ শিকার ৩০ বছর বয়সী দিনেশ সেভাটকর। গোধূলি বেলায় বনের একটি জলাশয়ের কাছে গেলে বাঘের মুখে পড়েন তিনি। এই মৃত্যুর খবর ছড়াতেই কয়েকশ গ্রামবাসী রিজার্ভে চড়াও হয়ে গেট ভেঙে ফেলেন, সরকারি গাড়ি ভাঙচুর করেন এবং বনের একাংশে আগুন ধরিয়ে দেন।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২ সালে মধ্যপ্রদেশে বাঘের সংখ্যা ছিল ৭৮৫, যা বর্তমানে ১০০০ ছাড়িয়েছে। কিন্তু সমস্যা হল বাঘের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গার অভাব। একজন পুরুষ বাঘের নিজের এলাকা বা ‘টেরিটরি’ তৈরির জন্য গড়ে ৫০ থেকে ১০০ বর্গকিলোমিটার জায়গা লাগে। ১০০০ বাঘের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৫০,০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা। অথচ মধ্যপ্রদেশের ৯টি ব্যাঘ্র প্রকল্প মিলিয়ে বনাঞ্চলের পরিমাণ মাত্র ১৬,২৩৩ বর্গকিলোমিটার।
এই বিশাল অসামঞ্জস্যই বাঘকে মানুষের লোকালয়ে টেনে আনছে। ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ সালের মধ্যে রাজ্যে বন্যপ্রাণের সঙ্গে সংঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন ৩৮০ জন মানুষ। প্রতি বছর গড়ে ৭০ থেকে ৯০ জনের মৃত্যু হচ্ছে এই রাজ্যে। জখম হওয়ার সংখ্যাও আকাশছোঁয়া, গত পাঁচ বছরে ৫,৭১৭ জন আহত হয়েছেন।
বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞদের মতে, অরণ্যের অভ্যন্তরে জায়গার লড়াই তীব্র হচ্ছে। গত এক দশকে নিজেদের মধ্যে লড়াই করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছে ৫০টিরও বেশি বাঘ ও চিতাবাঘ। শক্তিশালী বাঘেরা বনের মূল এলাকা দখল করে নেওয়ায় দুর্বল বাঘেরা লোকালয়ের দিকে সরে আসছে। পাশাপাশি অরণ্যে পর্যাপ্ত শিকারের অভাব থাকায় খাদ্যের সন্ধানেও বাঘেরা বাইরে বেরিয়ে আসছে।
বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞ অজয় দুবে বন দপ্তরের কড়া সমালোচনা করে জানান, “সংরক্ষণ মানে শুধু বাঘের সংখ্যা বাড়ানো নয়, তাদের বাসযোগ্য জমির বিস্তার ঘটানোও জরুরি। বন দপ্তরের সংঘাত মোকাবিলার ক্ষমতা অত্যন্ত দুর্বল। গ্রামবাসীদের সঙ্গে দপ্তরের কোনো আস্থার সম্পর্ক নেই। অনেক ক্ষেত্রেই গ্রামবাসীরা জানেন না যে কোর এলাকায় মহুল ফুল সংগ্রহ করতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটলে তাঁরা ক্ষতিপূরণও পাবেন না।”
পেন্স ছাড়াও সাতপুরা এবং বান্ধবগড় টাইগার রিজার্ভ থেকেও একই ধরণের অশান্তির খবর আসছে। একদিকে আদিবাসীদের বেঁচে থাকার টান, অন্যদিকে বাঘের অস্তিত্বের লড়াই— এই দুইয়ের চাপে ‘মোগলি ল্যান্ড’-এর রূপকথা আজ ফিকে হয়ে আসছে। বাঘের সংখ্যা বাড়িয়ে মধ্যপ্রদেশ রেকর্ড গড়লেও, সেই বাঘেদের নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে না পারলে এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত যে আগামী দিনে আরও ভয়াবহ রূপ নেবে, তা বলাই বাহুল্য।
