বাল্যবিবাহ এমন একটি সামাজিক ব্যাধি, যা আজও ভাইরাসের মতো রয়ে গিয়েছে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে। আর এই সমস্যাকে সমূলে বিনাশ করতে এবার অভিনব ও কড়া পদক্ষেপের পথে হাঁটতে চলেছে মহারাষ্ট্র সরকার। ভবিষ্যতে রাজ্যে বিয়ের নিমন্ত্রণপত্রে হবু বর ও কনের প্রকৃত জন্মতারিখ উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক করা হতে পারে। এই প্রস্তাব কার্যকর হলে বিয়ের কার্ড থেকেই সহজে যাচাই করা যাবে পাত্র-পাত্রীর বয়স, ফলে নাবালক-নাবালিকার বিয়ে গোপন রাখা অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়বে।
বুধবার মহারাষ্ট্র বিধানসভায় এই পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন রাজ্যের মহিলা ও শিশু কল্যাণ মন্ত্রী অদিতি তটকরে। বিজেপি বিধায়ক অতুল ভাতখলকরের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে রাজ্যে বাল্যবিবাহের হার ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনাই সরকারের লক্ষ্য। এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য ইতিমধ্যেই রাজস্থান সরকারের অভিজ্ঞতা খতিয়ে দেখছে মহারাষ্ট্র। রাজস্থানে দীর্ঘদিন ধরেই বিয়ের কার্ডে বর-কনের জন্মতারিখ উল্লেখ করার একটি প্রথা চালু রয়েছে। সেই মডেল কতটা কার্যকর হয়েছে এবং কীভাবে তা বাস্তবায়িত হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানতে রাজস্থান সরকারকে চিঠি পাঠিয়েছে মহারাষ্ট্র প্রশাসন।
মন্ত্রী জানান, গ্রামীণ উন্নয়ন দফতর, আইন ও বিচার বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক সংস্থাগুলির সঙ্গে আলোচনা করে এই নিয়ম মহারাষ্ট্রে কার্যকর করার সম্ভাবনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। সরকারের বিশ্বাস, এই ব্যবস্থা চালু হলে জাল নথি বা তথ্য গোপন করে নাবালক-নাবালিকার বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা অনেকটাই কমবে। এদিকে বিধানসভায় পেশ করা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজ্যে বাল্যবিবাহের হার ক্রমশ কমছে। ২০১৯-২১ সালের সমীক্ষায় যেখানে এই হার ছিল ২১.৯ শতাংশ, সেখানে ২০২৩-২৪ সালের সমীক্ষায় তা কমে হয়েছে ১৯.৬ শতাংশ। বর্তমানে জাতীয় গড় ২০.১ শতাংশের তুলনায় মহারাষ্ট্রের অবস্থান কিছুটা ভালো।
তবে শুধু পরিসংখ্যান নয়, প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য সাফল্যের দাবি করেছে সরকার। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে এখনও পর্যন্ত ১,৪৩৪টি বাল্যবিবাহ বন্ধ করা হয়েছে এবং এই সংক্রান্ত ১৩৬টি এফআইআর দায়ের হয়েছে। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে ১,৪৯৫টি এবং ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে ১,২৫৩টি বাল্যবিবাহ রোখা সম্ভব হয়েছিল। তুলনায় ২০১৮-১৯ সালে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ১৪৭। এই প্রসঙ্গে অদিতি তটকরে বলেন, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের সংখ্যা বৃদ্ধি মানেই বাল্যবিবাহ বেড়েছে, এমন নয়। বরং এটি প্রমাণ করে যে প্রশাসনের নজরদারি, রিপোর্টিং ব্যবস্থা এবং দ্রুত হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছে।
সরকার শুধু পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে নয়, বাল্যবিবাহে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সাহায্যকারীদের বিরুদ্ধেও কড়া অবস্থান নিয়েছে। মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনও পুরোহিত, মৌলবি, ব্যান্ড পার্টি বা অন্য কোনও ব্যক্তি যদি জেনেবুঝে নাবালক-নাবালিকার বিয়ে সম্পন্ন করতে সাহায্য করেন, তবে তাঁদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই লক্ষ্য পূরণে জেলাশাসকদের নেতৃত্বে জেলা টাস্ক ফোর্স, গ্রাম সুরক্ষা কমিটি এবং পঞ্চায়েত স্তরের বিভিন্ন কমিটিকে আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে। বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে সেই সব এলাকায়, যেখানে পরিযায়ী শ্রমিকদের সংখ্যা বেশি।
সরকারি পর্যবেক্ষণে দেখা গিয়েছে, বিশেষ করে বিড়, ছত্রপতি সম্ভাজিনগর, পারভানি এবং মারাঠওয়াড়ার বিভিন্ন জেলায় জীবিকার খোঁজে পরিবারের পরিযানের সঙ্গে বাল্যবিবাহের যোগ রয়েছে। আখের খেতে কাজ করতে দূরে যাওয়ার সময় অনেক পরিবার মেয়েদের নিরাপত্তার অজুহাতে অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে দেয়। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় পরিযায়ী শ্রমিকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি পরিযানের সময় শিশুদের পড়াশোনা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও বেশি চাইল্ড কেয়ার সেন্টার এবং আবাসিক হোম তৈরির পরিকল্পনা করেছে সরকার।
বিয়ের কার্ডে লিখতেই হবে বর-কনের জন্মতারিখ! বাল্যবিবাহ রুখতে ‘নজিরবিহীন’ পদক্ষেপ সরকারের