ওড়িশা বা অসমের মতো প্রতিবেশী রাজ্যগুলি সাম্প্রতিক অতীতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে পশ্চিমবঙ্গকে টপকে গিয়েছে। এই আবহে রাজ্যকে পুনরায় বাণিজ্যের মূল স্রোতে ফেরাতে একগুচ্ছ নতুন পরিকল্পনা ও মেগা বিনিয়োগের রোডম্যাপ প্রকাশ করল সরকার। একটি বিশেষ বাণিজ্য সম্মেলনে রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন, “বেঙ্গল ইজ ব্যাক। ব্যাক উইথ আ ব্যাং।” তবে অতীতের খতিয়ান টেনে তিনি অকপটে স্বীকার করেন, পশ্চিমবঙ্গ একসময় ‘অখুশি রাজ্য’ (Unhappy State)-এ পরিণত হয়েছিল। সাধারণ মানুষ থেকে শিল্পপতি— সবার মনে জমে থাকা ক্ষোভ দূর করতে এখন যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ চলছে।ওড়িশার সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার কথা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী জানান, রাজ্যে এখন সম্পূর্ণ ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। রাজ্য বাজেটকে ‘কেন্দ্রের বাজেট’ বলে সমালোচনা করা হলেও, তিনি স্পষ্ট করেন যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমনের এই আর্থিক সাহায্য বাংলার স্বার্থেই অত্যন্ত জরুরি।
শিল্পমহলকে আশ্বস্ত করে তিনি দুটি বড় ঘোষণা করেছেন--
১)জমি আইনের সরলীকরণ দ্বারা শিল্পপতিদের দীর্ঘদিনের দাবি মেনে ‘ল্যান্ড সিলিং অ্যাক্ট’ সহজ করার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
২)২৪ ঘণ্টা ব্যবসা অর্থাৎ নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে খুচরো বিক্রেতা বা রিটেইল সেক্টরের জন্য ২৪ ঘণ্টা দোকান খোলা রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
রাজ্যের শিল্পায়নে গতি আনতে একাধিক দেশি-বিদেশি বহুজাতিক সংস্থা বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগের ঘোষণা করেছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম হিসেবে উঠে আসছে--হলদিয়া পেট্রোকেমিকেলস,এল অ্যান্ড টি,পিয়ারলেস,পিডব্লিউসি'র মতন নামজাদা শিল্পোদ্যোগী সংস্থাগুলি।এছাড়াও সূত্র মারফত জানা যাচ্ছে; লাক্স, রশ্মি, মতন নামী শিল্প তথা বানিজ্যিক সংস্থাগুলিও পুনরায় পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আগ্রহ দেখাচ্ছে।

জানা যাচ্ছে আগামী দুর্গাপুজোর আগেই রাজ্যে ৬,০০০ কোটি টাকার একটি বিশাল প্ল্যান্ট তৈরি করতে চলেছে হলদিয়া পেট্রোকেমিকেলস। 
রাজ্যে একটি ৩০ মেগাওয়াটের মেগা ডেটা সেন্টার স্থাপন করবে এল অ্যান্ড টি। যা প্রায় ২৫,০০০ সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে।
পিয়ারলেস কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে মোট ১,০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হবে (যার মধ্যে ৪০০ কোটি টাকা ক্যানসার চিকিৎসায় এবং ১৫০ কোটি টাকা বারাসাত জেলা হাসপাতালের আধুনিকীকরণে ব্যয় হবে)। এছাড়া ২০২৯ সালের মধ্যে আবাসন ও মল নির্মাণের জন্য আরও ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হবে।
রাজ্য বাজেটে ঘোষিত ঐতিহাসিক সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে অংশীদার হতে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেছে পিডব্লিউসি।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা সঞ্জীব সান্যাল জানান, ১৯৬০ সালেও দেশের গড় মাথাপিছু আয়ের তুলনায় বাংলার মানুষের আয় ২৭ শতাংশ বেশি ছিল, যা আজ দেশের গড় আয়ের চেয়ে ২০ শতাংশ নীচে নেমে গিয়েছে। তবে “বাঙালির রক্তেই ব্যবসা আছে” উল্লেখ করে তিনি কলকাতার অব্যবহৃত জমিকে সঠিক বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে শহরটিকে পুনরায় অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরামর্শ দেন।
পাশাপাশি, প্রবীণ নেতা তাপস রায় ‘লাইসেন্স রাজ’ অবসান ঘটিয়ে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও সহজ পদ্ধতিতে শিল্প গড়ার অনুমতি দেওয়ার আশ্বাস দেন। অন্যদিকে, টেনিস তারকা লিয়েন্ডার পেজ জাতীয় স্তরে বাংলার খেলোয়াড়দের অনুপস্থিতি নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেন এবং আগামী ২০ বছরে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন শিশুকে ক্রীড়াক্ষেত্রে দক্ষ করে তোলার একটি দূরদর্শী পরিকল্পনার কথা জানান।