‘জেল নয়, সম্পত্তিও যাবে!’ বিধানসভায় দুর্নীতিবিরোধী যুদ্ধের ডাক শুভেন্দুর
'নিয়োগ হবে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে, নেতা বা মন্ত্রীর হস্তক্ষেপ থাকবে না'
কলকাতা, ২৩ জুন: বিধানসভার অধিবেশনে মঙ্গলবার কার্যত আক্রমণাত্মক মেজাজেই দেখা গেল মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে। রাজ্যপালের ভাষণের উপর ধন্যবাদ জ্ঞাপক প্রস্তাবের জবাব দিতে গিয়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁর সরকারের লড়াই এখন আরও কঠোর পর্যায়ে পৌঁছতে চলেছে।
মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন, চলতি অধিবেশনের শেষ দিনেই দুর্নীতি দমনে নতুন আইন আনা হবে। সেই আইনে দুর্নীতির অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের শুধু কারাবাস নয়, তাঁদের সম্পত্তিও বাজেয়াপ্ত করা হবে। এমনকি সেই সম্পত্তি নিলাম করে জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহার করার কথাও বলেন তিনি।
বক্তব্য রাখতে গিয়ে নাম না করেই তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিশানা করেন শুভেন্দু। তাঁর মন্তব্য, “অনেকে ভাবছেন দু’মাস জেলে থেকে বেরিয়ে এলেই সব শেষ। কিন্তু এবার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হবে। প্রাসাদে সাধারণ মানুষের থাকার ব্যবস্থা করা হবে।”
দুর্নীতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও দাবি করেন, পূর্বতন সরকারের আমলে বীরভূমের পাথর খাদান থেকে বছরে প্রায় ১২০০ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হওয়ার কথা থাকলেও সরকারের কোষাগারে পৌঁছত মাত্র ১০০ কোটি টাকা। বাকি অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে যেত বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর দাবি, ক্ষমতায় আসার পর প্রথম মাসেই ওই খাত থেকে ৮৩ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হয়েছে, যা আগের প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
শুধু আর্থিক দুর্নীতিই নয়, সরকারি নিয়োগ ব্যবস্থার সংস্কারের কথাও ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, ভবিষ্যতে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ পদ্ধতিতে, অনেকটা ইউপিএসসি-র ধাঁচে। কোনও রাজনৈতিক নেতা বা মন্ত্রীর হস্তক্ষেপ থাকবে না।
বক্তৃতার বড় অংশ জুড়ে ছিল পূর্বতন সরকারের বিরুদ্ধে তাঁর অভিযোগের খতিয়ান। ফিকিকে ৩২৪ কোটি টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। পাশাপাশি মনরেগা, আবাস যোজনা, জল জীবন মিশন ও লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসুর নেতৃত্বে গঠিত কমিশনের কথাও উল্লেখ করেন।
বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কেও কটাক্ষ করতে ভোলেননি শুভেন্দু। তাঁর উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য, “মস্তিষ্কে ডাল-ভাত, হৃদয়ে লেনিন-মাও।” সুরাবর্দি অ্যাভিনিউয়ের নাম পরিবর্তন নিয়েও তর্ক-বিতর্কে জড়ায় শাসক ও বিরোধী শিবির।
তবে দুর্নীতির পাশাপাশি অনুপ্রবেশ রোধের বিষয়টিও ছিল মুখ্যমন্ত্রীর ভাষণের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। তিনি দাবি করেন, এখনও পর্যন্ত ১০ হাজার অনুপ্রবেশকারীকে চিহ্নিত করে ফেরত পাঠানো হয়েছে। আরও ১৮০০ জন বিভিন্ন হোল্ডিং সেন্টারে রয়েছেন এবং তাঁদেরও পর্যায়ক্রমে ফেরত পাঠানো হবে। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণে বিএসএফকে ১৪২.৭৯ একর জমি হস্তান্তরের কথাও জানান তিনি।
বক্তৃতার শেষে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট বার্তা দেন- দুর্নীতি, অনুপ্রবেশ এবং প্রশাসনিক অনিয়মের বিরুদ্ধে তাঁর সরকারের অবস্থান আপসহীন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সুর চড়িয়ে দাবি করেন, “তৃণমূল আর ফিরবে না।”