তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে নজিরবিহীন ক্ষমতার লড়াই ও চরম সাংগঠনিক সংঘাত এবার প্রকাশ্যে চলে এল। দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে খোদ তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে কলকাতার মেয়র তথা রাজ্যের মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমসহ বেশ কিছু প্রথম সারির নেতা-নেত্রীকে শো-কজ নোটিশ পাঠানো হয়েছিল। এদের মধ্যে অন্যতম হলেন অরূপ বিশ্বাসের মতো প্রাক্তন মন্ত্রী তথা স্নেহাশিস চক্রবর্তীর মতো নেতা। এছাড়াও এই নোটিশ গিয়েছে সাবিনা ইয়াসমিন,বিপ্লব মিত্র এবং রথীন ঘোষের কাছেও। এবার বহিষ্কার করা হল এই নেতৃত্বদের।
দলনেত্রীর সেই হাইপ্রোফাইল পদক্ষেপকে সরাসরি ‘অবৈধ’ এবং ‘অর্থহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়ে তীব্র রাজনৈতিক আলোড়ন সৃষ্টি তুলেছিলেন বিধায়ক সন্দীপন সাহা। তাঁর সাফ দাবি, নবগঠিত ‘ন্যাশনাল ওয়ার্কিং কমিটি’ ছাড়া দলের আর কারও কাউকে শোকজ করার বিন্দুমাত্র অধিকার নেই।
সম্প্রতি দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও নীতি নির্ধারণকে কেন্দ্র করে ফিরহাদ হাকিমসহ একাধিক প্রবীণ ও প্রভাবশালী নেতা-নেত্রীকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে শোকজ করা হয়েছে। নেত্রীর এই কড়া পদক্ষেপে যখন দলের অন্দরে তীব্র চাঞ্চল্য, ঠিক তখনই আসরে নামেন বিধায়ক সন্দীপন সাহা। তিনি ফিরহাদ হাকিম ও অন্যান্য বিড়ম্বনায় পড়া নেতাদের পক্ষে পরোক্ষ সওয়াল করে সরাসরি শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তকেই কাঠগড়ায় তোলেন।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সন্দীপন সাহার এই বয়ানে তৃণমূলের অন্দরে তৈরি হওয়া গভীর ফাটল স্পষ্ট করে দেখা যাচ্ছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো একাধিপত্যবাদী নেত্রীর সিদ্ধান্তকে এভাবে প্রকাশ্য মঞ্চে ‘অবৈধ’ তকমা দেওয়া অত্যন্ত নজিরবিহীন ঘটনা। ফিরহাদ হাকিমসহ শীর্ষ নেতাদের ওপর কোপ পড়ার পর, দলের একাংশ যে নতুন জাতীয় কর্মসমিতিকে ঢাল করে নেত্রীর ক্ষমতার সমান্তরাল এক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চাইছে—সন্দীপনের মন্তব্য তারই অকাট্য প্রমাণ।
সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সন্দীপন সাহা অত্যন্ত কড়া ভাষায় জানিয়েছেন-- "ন্যাশনাল ওয়ার্কিং কমিটি আজ অ্যানাউন্স করা হয়েছে। ন্যাশনাল ওয়ার্কিং কমিটি ছাড়া বাকি কারও অধিকার নেই কাউকে শোকজ করার। কাজেই কে শোকজ করল, কে শোকজ করল না, এটার এখন কোনও অর্থ নেই। ন্যাশনাল ওয়ার্কিং কমিটি যেটা ঠিক করেছে, সেটাই বৈধ। বাকি সব অবৈধ।"
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্রোহী তৃণমূল কংগ্রেস শিবিরের মুখ্যনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় কটাক্ষ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন-- কীসের শো, কীসের কজ? একটা সংগঠন আছে বলে দাবি করেন । আমরা বলি সং আছে, গঠন নেই।"এই প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেছিলেন যে-- "ধরুন কমিটি ঘোষণা হচ্ছে দুপুরবেলা । যাঁদের নাম ঘোষণা হচ্ছে, বিকালবেলা তাঁরা বলছেন, তাঁরা নেই । ধরুন কমিটি ঘোষণা হচ্ছে সকাল বেলা । যাঁদের নাম ঘোষণা হচ্ছে, তাঁরা তার আগের দিনই দিল্লি চলে গিয়েছেন । কমিটি ঘোষণা হচ্ছে, যখন যাঁর নাম ঘোষণা হচ্ছে, তখন তিনি হয়তো আমাদের ঘরে বসে রয়েছেন;পদত্যাগ করছেন।"
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের ভাবনা তৃণমূল কংগ্রেসের কোষাগারে থাকা প্রায় ২০০০ কোটি টাকার দখল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে মরিয়া দুই শিবিরই। একারনেই এই 'যোগ-বিয়োগ' খেলা চলছে।
আগামী দিনে এই ‘বৈধ ও অবৈধ’ বিতর্কের জল কোন দিকে গড়ায় এবং দলের শীর্ষ নেতৃত্ব এর জবাবে কী পদক্ষেপ নেয়, এখন সেটাই দেখার। তবে বিধায়কের এই মন্তব্য যে দলের অন্দরে এক নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
মমতাপন্থী তৃণমূল বহিষ্কার করল ফিরহাদ হাকিম সহ বহু নেতৃত্বকে