জোর কদমে চলছে পুজোর কাউন্ট ডাউন। দুর্গাপুজোর বাকি আর মাত্র ২৬ দিন। আর সেই পুজো যত এগিয়ে আসছে, ততই উদ্বেগ আর দুঃশ্চিন্তায় ঘুম ছুটেছে ঢাকিদের। আশঙ্কাটা তাঁদের বেশি, যাঁরা এবারও দুটো বাড়তি টাকা রোজগারের আশায় ভিনরাজ্যে পাড়ি জমাতে চান। বাংলায় কথা বলা পরিযায়ী শ্রমিকদের সাম্প্রতিক হেনস্থা ও সেই নিয়ে নানান খবরে ঢাকিরা রীতিমতো আতঙ্কিত। তাই সুরক্ষিত থাকতে ভোটার ও আধার কার্ডের মতো নথিপত্রের পাশাপাশি এবার পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেটও সংগ্রহ করতে এখন থানায় ছুটছেন।
ভাদ্র মাসের শুরুর দিক থেকেই ঢাকিদের তোড়জোড় আস্তে আস্তে শুরু হয়ে যায়। ঢাকের কাঠের খোলের দুই মুখে পুরু চামড়ার ছাউনিটা ঠিকঠাক আছে কি না দেখে নেওয়া। না থাকলে অল্প-বিস্তর মেরামতি, কিংবা প্রয়োজনে পুরনোটা বাতিল করে নতুন চামড়া লাগানো। সব কাজই সেরে নিতে হয় দ্রুত। ঢাকে পাশের দড়িতে বোল তোলার দুটি কাঠি তো থাকেই, বাড়তি কয়েকটা কাঠিও তৈরি রাখতে হয় তাঁদের। এর সঙ্গে চলে নিত্যনতুন বোল বাজানোর অনুশীলন। পুজোর পাঁচ দিনে ঢাক থেকে পাঁচ রকমের আওয়াজ তোলা তাঁদের কাছে মাস্ট।
এবছর এই দিকটায় তেমনভাবে আর মন লাগাতে পারেননি গ্রামবাংলার প্রত্যন্ত এলাকার ঢাকিরা। ভিনরাজ্যের বায়নায় যাওয়ার জন্যে যাবতীয় নথিপত্র জোগাড় করতেই তাঁদের অনেকটা সময় চলে গেছে। পরিবারের সদস্যদের আশ্বস্ত করতে থানায়ও হত্যে দিয়ে পড়ে থাকতে হচ্ছে পিসিসি (পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট)-র জন্যে। এত ঝক্কি মাথায় নিয়ে ভিনরাজ্যে কেন যাচ্ছেন তাও খোলাখুলি বলেছেন ঢাকিরা। বলেছেন কলকাতায় এক একটা সর্বজনীনে যখন পুজোর পাঁচ দিনের জন্য ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা মেলে, সেখানে দিল্লি-মুম্বইতে গেলে পাওয়া যায় ১৫০০০ থেকে ২৫০০০ টাকা। এর সঙ্গে বিনামূল্যে থাকা ও খাওয়া ছাড়া পাওয়া যায় যাতায়াত ভাড়া। দিন আনি দিন খাই পরিবারগুলির কাছে তাই পুজোর কটা দিনই হল বাড়তি রোজগারের একটা সুযোগ
এবছরের দুর্গাপুজোয় ঢাকিদের এমন উদ্বেগ আর আশঙ্কার কিন্তু যথেষ্ট কারণও রয়েছে। গত মাস তিনেক ধরে বাংলা থেকে যাওয়া পরিযায়ী শ্রমিকদের হেনস্থার মুখে পড়তে হয়েছে দিল্লি সহ বিজেপি শাসিত বেশ কিছু রাজ্যে। অবিজেপি রাজ্যেও বাঙালি পরিযায়ীদের বিড়ম্বনায় পড়ার খবর উঠে এসেছে সংবাদমাধ্যমে। মোদ্দা কথা, পরিযায়ী বাঙালি শ্রমিকদের অভিযোগ, তাদের বাংলা ভাযায় কথা বলার কারণেই নথিপত্র যাচাইয়ের নাম করে তাঁদের আটক করে রাখা হয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে শারীরিক নির্যাতনেরও শিকার হতে হয়েছে।
কিছু বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিক সহ তাঁদের পরিবারের সদস্যদের, বাংলাদেশে জোর করে ঠেলে পাঠানো হয়েছে। ভারতীয় পরিচয়পত্র ভোটার কার্ড, আধার কার্ড এমনকি জমির রেকর্ডও দেখাতে হয়েছে অনেককে। বর্ধমান জেলার বাসিন্দা তিন নাবালক এবং একজন গর্ভবতী মহিলা সহ কমপক্ষে ৬ জন পরিযায়ী বাঙালি এখনও বাংলাদেশের জেলে বন্দি। আর সেই কারণেই পুজোয় ভিনরাজ্যে বাজানোর জন্য ঢাকিরা সব ধরনের সাবধানতা আগাম নিয়ে রাখছেন।
পরিযায়ী বাঙালিদের ভিনরাজ্যে হেনস্থা ঘিরে সরব মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিজেপি শাসিত রাজ্যে বাঙালিদের প্রতি যে আচরণ করা হচ্ছে তা নিয়ে মাঝে মধ্যেই কড়া আক্রমণ করছেন রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান। তাঁর দাবি, বাংলার যে ২২ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক আছেন, তাঁরা তাঁদের কাজের দক্ষতার জন্যই নিযুক্ত। কেউ তাঁদের প্রতি করুণা করেছে বলে নয়। তবুও তাঁদের উপর নির্যাতন ও লাঞ্ছনা করা হচ্ছে।
পুজোর সময় বাংলার ঢাকিদের ভিনরাজ্যে হেনস্থার মুখে পড়তে হলে দিল্লি অভিযানের আগাম হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বাঁকুড়ার সাংসদ অরূপ চক্রবর্তী। প্রয়োজনে ঢাকিদের নিয়ে সংসদ ভবন ঘেরাওয়ের রাস্তাও বেছে নেওয়া হবে বলে মন্তব্য করেছেন। সব মিলিয়ে শিউলি ঝরা শরতে পুজোর দিনগুলিতে এবার ঢাকিদের দিকেও থাকবে বাড়তি নজর।
