
নির্বাচনের বাদ্যি বাজতেই ফের রাজনীতির দাবার বোর্ডে উন্নয়নের চাল। আজ ১৭ জানুয়ারি, ২০২৬-এ মালদহের মাটি থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যে বহুমুখী প্রকল্পের ঘোষণা করলেন, তাকে ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক দানা বেঁধেছে। একদিকে রেল ও সড়কের ৩,২৫০ কোটি টাকার উন্নয়ন উপহার, অন্যদিকে রাজ্য সরকারকে তীব্র আক্রমণ—দুইয়ের মিশেলে মোদির এদিনের সফর ছিল অত্যন্ত ইঙ্গিতপূর্ণ। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, নির্বাচনের আগে সাজানো এই ‘উন্নয়নের পসরা’ কি সত্যিই তিমির ঘুচিয়ে আলোর মুখ দেখবে? না কি অতীতের মতো অনেক ঘোষণাই বাস্তবায়নের অভাবে ফাইলেই বন্দি থাকবে?
এদিনের কর্মসূচির মূল আকর্ষণ ছিল দেশের প্রথম ‘বন্দে ভারত স্লিপার’ ট্রেনের উদ্বোধন। হাওড়া থেকে গুয়াহাটির (কামাখ্যা) মধ্যে চলাচলকারী এই ট্রেনটি ভারতের রেল পরিষেবায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এছাড়া ৪টি নতুন অমৃত ভারত ট্রেন, বালুরঘাট-হিলি নতুন রেললাইন এবং ধুপগুড়ি-ফালাকাটা ফোর লেন রাস্তার শিলান্যাস করে মোদি বোঝাতে চেয়েছেন, উত্তরবঙ্গ তথা সমগ্র বাংলার যোগাযোগ ব্যবস্থায় কেন্দ্র কতটা আন্তরিক। মালদহের বিশাল জনসভা থেকে প্রধানমন্ত্রী এদিন রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেন। তিনি সরাসরি অভিযোগ করেন, কেন্দ্রীয় সরকার বাংলার সাধারণ মানুষের জন্য বারবার কোটি কোটি টাকা এবং হাজারো প্রকল্প পাঠালেও রাজ্য সরকার তা সঠিক জায়গায় পৌঁছাতে দেয়নি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, “রাজ্যের বর্তমান প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে বাংলার মানুষ কেন্দ্রীয় উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।” তিনি দাবি করেন, মোদি সরকার বাংলার মানুষের হাতে সরাসরি সুবিধা পৌঁছে দিতে চাইলেও রাজ্যের অসহযোগিতা সেখানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে এদিন সবথেকে জোরালো ছিল ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের প্রয়োজনীয়তার কথা। তিনি বাংলার মানুষকে মনে করিয়ে দেন, রাজ্যে এবং কেন্দ্রে একই দলের সরকার থাকলে উন্নয়নের গতি দ্বিগুণ হয়। তাঁর কথায়, “পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এখন কেবল কথার কথা নয়, বরং উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং স্বচ্ছ প্রশাসন চান।” তিনি ‘আসল পরিবর্তন’-এর ডাক দিয়ে বলেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে তবেই প্রতিটি কেন্দ্রীয় প্রকল্প ঘরে ঘরে পৌঁছাবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মোদি এদিন পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে—রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির আমূল বদল না হলে উন্নয়ন থমকে থাকবে। প্রতিটি নির্বাচনের আগেই রাজনৈতিক দলগুলো উন্নয়নের এক রঙিন মানচিত্র তুলে ধরে। বিরোধী শিবির মোদির এই সফরকে ‘ইলেকশন স্টান্ট’ বলে কটাক্ষ করলেও, সাধারণ মানুষের একাংশ বন্দে ভারত স্লিপার বা নতুন রেললাইনের ঘোষণায় আশার আলো দেখছেন। তবে অভিজ্ঞ মহলের দাবি, এর আগে অনেক ঘটা করে ঘোষিত প্রকল্পও নির্বাচনের পর আর বাস্তবায়িত হয়নি। রাজ্য ও কেন্দ্রের মধ্যে এই দড়িটানাটানি এবং প্রশাসনিক টানাপোড়েনে আখেরে সাধারণ মানুষই যে তিমিরে ছিল সেখানেই থেকে যায়।
মোদি আজ নিজেকে ‘কল্পতরু’ হিসেবে উপস্থাপন করে বাংলার জন্য ৩,২৫০ কোটির ডালি সাজিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু এই প্রকল্পের সাফল্য নির্ভর করছে বাস্তবায়নের ওপর। বঞ্চনার অভিযোগ তুলে এবং ডবল ইঞ্জিন সরকারের স্বপ্ন দেখিয়ে মোদি যে রাজনৈতিক চালটি চাললেন, তার ফল ২০২৬-এর নির্বাচনী বাক্সে কতটা প্রতিফলিত হয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়। সময় বলে দেবে, এই ঘোষণা কি নিছকই ভোটের খসড়া না কি বাংলার উন্নয়নের নতুন দিগন্ত।।
