কলকাতা: তারাতলার নির্মীয়মাণ গুদামের শেড ধসের পর কেটে গিয়েছে দু'দিন। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে একের পর এক দেহ উদ্ধার হলেও, এখনও ভিতরে কেউ আটকে রয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত হতে কোনও ঝুঁকি নিতে চাইছে না উদ্ধারকারী বাহিনী। সেই কারণেই এবার উদ্ধার অভিযানে ব্যবহার করা হচ্ছে ভারতীয় সেনার অত্যাধুনিক ভিকটিম লোকেটিং ক্যামেরা। ভবন ধস, ভূমিকম্প বা খনিধসের মতো বিপর্যয়ে বহু দেশে ব্যবহৃত এই প্রযুক্তিই এখন তারাতলার ধ্বংসস্তূপে প্রাণের শেষ সন্ধান চালাচ্ছে।
সেনা সূত্রের খবর, এই বিশেষ ক্যামেরা মূলত এমন জায়গায় ব্যবহার করা হয়, যেখানে মানুষের পক্ষে সরাসরি পৌঁছনো প্রায় অসম্ভব। ধ্বংসস্তূপের নীচে বিশাল কংক্রিটের স্ল্যাব, লোহার বিম কিংবা ভেঙে পড়া কাঠামোর ফাঁক দিয়ে একটি সরু ফাইবার-অপটিক ক্যামেরা প্রবেশ করানো হয়। ক্যামেরার মাথায় থাকে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন এলইডি আলো এবং হাই-রেজ়োলিউশন সেন্সর, যা সম্পূর্ণ অন্ধকারেও ভিতরের স্পষ্ট ছবি উদ্ধারকারী দলের কাছে পৌঁছে দেয়।
তবে এই প্রযুক্তির বিশেষত্ব শুধু ছবি দেখাতেই সীমাবদ্ধ নয়। ক্যামেরার সঙ্গে যুক্ত থাকে অত্যন্ত সংবেদনশীল অডিও সিস্টেম ও সেন্সর। ফলে ধ্বংসস্তূপের ভিতরে যদি কোনও ব্যক্তি আটকে থাকেন, তাঁর সামান্য নড়াচড়া, শ্বাস-প্রশ্বাস, টোকা দেওয়ার শব্দ কিংবা ক্ষীণ আওয়াজও শনাক্ত করার চেষ্টা করা যায়। কোথাও জীবিত মানুষের উপস্থিতির ইঙ্গিত মিললে সেই অংশে ভারী যন্ত্র ব্যবহার না করে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ধ্বংসাবশেষ কেটে উদ্ধার অভিযান চালানো হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ক্যামেরা ব্যবহারের সবচেয়ে বড় সুবিধা হল 'টার্গেটেড রেসকিউ'। অর্থাৎ, অন্ধভাবে ধ্বংসস্তূপ সরানোর পরিবর্তে আগে নিশ্চিত হওয়া যায় কোথায় মানুষের উপস্থিতি রয়েছে। এতে একদিকে যেমন উদ্ধারকাজের গতি বাড়ে, তেমনই আটকে থাকা ব্যক্তির উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ার ঝুঁকিও অনেক কমে।
তারাতলার ঘটনায় ভারতীয় সেনা, জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ), রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী, দমকল এবং কলকাতা পুলিশের যৌথ বাহিনী দিনরাত উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ভারী ক্রেন ও গ্যাস কাটারের পাশাপাশি অত্যাধুনিক অনুসন্ধান প্রযুক্তিও ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে ধ্বংসস্তূপের কোনও অংশই নজর এড়িয়ে না যায়।
উদ্ধারকারী বাহিনীর এক আধিকারিকের কথায়, ভবন ধসের ঘটনায় প্রথম ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যেই যদি কোথাও প্রাণের স্পন্দন থেকে থাকে, তা শনাক্ত করতে ভিকটিম লোকেটিং ক্যামেরা অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা নেয়। সেই কারণেই তারাতলার ধ্বংসস্তূপে প্রতিটি ইঞ্চি খুঁটিয়ে পরীক্ষা করছে সেনার বিশেষজ্ঞ দল।
ধ্বংসস্তূপের নীচে এখনও কেউ জীবিত রয়েছেন কি না, তার উত্তর মিলবে উদ্ধার অভিযান শেষ হলেই। কিন্তু প্রযুক্তির সাহায্যে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত একটি প্রাণও বাঁচানোর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে উদ্ধারকারী বাহিনী। আর সেই লড়াইয়েই এখন অন্যতম ভরসা হয়ে উঠেছে সেনার অত্যাধুনিক ভিকটিম লোকেটিং ক্যামেরা।
সেনার ভরসা অত্যাধুনিক ‘ভিকটিম লোকেটিং ক্যামেরা’, কীভাবে কাজ করে এই প্রযুক্তি?