পরপর দু'টি শক্তিশালী ভূমিকম্পে কার্যত বদলে দিয়েছে ভেনেজুয়েলার ডেমোগ্রাফি। সরকারি সূত্রের দাবি, গত এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে এটিই ভেনেজুয়েলার ইতিহাসে অন্যতম শক্তিশালী এবং বিধ্বংসী ভূমিকম্প। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৭.১। এর মাত্র ৩৯ সেকেন্ড পর একই অঞ্চলে আরও একটি ৭.৫ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। দুটি কম্পনেরই উৎসস্থল ছিল রাজধানী কারাকাস থেকে প্রায় ১৬৮ কিলোমিটার পশ্চিমে ক্যারিবীয় উপকূলবর্তী মোরন অঞ্চলের পশ্চিমাংশে। প্রথম কম্পনের উৎপত্তি হয় ভূপৃষ্ঠের মাত্র ১৩ কিলোমিটার গভীরে এবং দ্বিতীয়টির গভীরতা ছিল প্রায় ১০ কিলোমিটার। অগভীর গভীরতায় উৎপন্ন হওয়ায় ভূমিকম্পের অভিঘাত আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ভূমিকম্পে বহু ভবন ধসে পড়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সড়ক, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। উদ্ধারকারী দল ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারি হিসেবে প্রাণহানির সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। প্রশ্ন উঠছে, ভেনেজুয়েলায় কি প্রায়ই এমন শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়? পরিসংখ্যান বলছে, দেশটিতে ভূমিকম্প নতুন নয়। 'earthquakelist.org'-এর তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে (২০১৬-২০২৬) ভেনেজুয়েলার ৩০০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে রিখটার স্কেলে ৪ বা তার বেশি মাত্রার প্রায় ৯৫৯টি ভূমিকম্প নথিভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ বছরে গড়ে প্রায় ৯৫টি এবং মাসে প্রায় সাতটি ভূকম্পন অনুভূত হয়। তবে এর অধিকাংশই ছিল মৃদু বা মাঝারি মাত্রার। ৭ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প সেখানে অত্যন্ত বিরল।

ভৌগোলিক অবস্থানও এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ। ভেনেজুয়েলা দক্ষিণ আমেরিকান এবং ক্যারিবীয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলের কাছাকাছি অবস্থিত। একাধিক ফল্ট লাইনের প্রভাব থাকলেও দেশটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় 'রিং অফ ফায়ার'-এর অন্তর্ভুক্ত নয়। ফলে মেক্সিকো, চিলি বা জাপানের মতো নিয়মিত ভয়াবহ ভূমিকম্প সেখানে দেখা যায় না। তবে দীর্ঘ সময় শান্ত থাকার পর হঠাৎ করেই শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে, সাম্প্রতিক ঘটনাই তার বড় উদাহরণ।

গত এক দশকে ভেনেজুয়েলায় কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকম্পেরও নজির রয়েছে। ২০১৮ সালের ২১ আগস্ট কারুপানো অঞ্চলের কাছে ৭.৩ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছিল। ২০২৪ সালের ২২ জুন একই এলাকায় ৬.০ মাত্রার কম্পন অনুভূত হয়। ২০২৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর পশ্চিম ভেনেজুয়েলার ভ্যালেরা অঞ্চলে পরপর ৬.২ এবং ৬.৩ মাত্রার দুটি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছিল। আর ২০২৬ সালের ২৪ জুনের ৭.১ ও ৭.৫ মাত্রার জোড়া ভূমিকম্প সেই সব ঘটনাকেও ছাপিয়ে গিয়েছে।

ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ বিপর্যয় অবশ্য আরও বহু পুরানো। ১৮১২ সালের ২৬ মার্চ বোকোনো ফল্ট লাইনে সৃষ্ট ভয়াবহ ভূমিকম্পে রাজধানীl কারাকাস-সহ একাধিক শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। সেই বিপর্যয়ে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল বলে ঐতিহাসিক নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এরপর ১৯৬৭ সালের ২৯ জুলাই কারাকাস উপত্যকায় ৬.৩ মাত্রার আর একটি বড় ভূমিকম্প আঘাত হানে। সেই ঘটনার পর ভূমিকম্প নিয়ে গবেষণা এবং ভবিষ্যৎ দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য বিশেষ 'প্রেসিডেন্সিয়াল আর্থকোয়েক কমিশন' গঠন করেছিল ভেনেজুয়েলা সরকার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনেজুয়েলায় নিয়মিত বড় ভূমিকম্প না হলেও ভূতাত্ত্বিক অবস্থানের কারণে মাঝেমধ্যেই প্রকৃতি ভয়ংকর রূপ ধারণ করতে পারে। সাম্প্রতিক এই জোড়া ভূমিকম্প সেই সতর্কবার্তাকেই আরও একবার সামনে এনে দিল।