আমাদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় এমন কিছু খাবার জায়গা করে নিয়েছে, যেগুলো খেতে ভালো লাগলেও স্বাস্থ্যের পক্ষে ধীরে ধীরে বিষ হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে ময়দা, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, সাদা রুটি, ভাত, আলু এবং প্রক্রিয়াজাত চিনি এই ছয়টি খাবার বর্তমানে অধিকাংশ মানুষ নিয়মিত খেয়ে চলেছেন। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, এই খাবারগুলো উচ্চ গ্লাইসেমিক সূচকযুক্ত, অর্থাৎ শরীরে প্রবেশ করামাত্রই রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ হঠাৎ করে বেড়ে যায়। নয়াদিল্লির প্রখ্যাত চিকিৎসক ডাঃ সুরেন্দ্র কুমারের মতে, ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এই অভ্যাসগুলো অত্যন্ত বিপজ্জনক, কারণ এতে রক্তে শর্করার মাত্রা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ২৫০-৩০০ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে
ময়দা: ময়দা শরীরের পক্ষে খুব ক্ষতিকর। এটি পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট, যা ফাইবারবিহীন এবং সহজেই হজম হয়ে গিয়ে রক্তে গ্লুকোজ বাড়িয়ে দেয়। ময়দা দিয়ে তৈরি খাবার যেমন পিৎজা, বিস্কুট বা সিঙাড়া খাওয়া ডায়াবেটিস, ইনফ্ল্যামেশন, পেটের চর্বি ও অ্যাসিডিটির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ময়দার বদলে মাল্টিগ্রেইন, বাজরা বা রাগির মতো স্বাস্থ্যকর বিকল্প বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। তেমনই ইনস্ট্যান্ট নুডলস—যা দুই মিনিটে তৈরি হলেও দীর্ঘদিন ধরে শরীরে নানা অসুস্থতা তৈরি করে। এতে থাকে ময়দা, সোডিয়াম ও প্রিজারভেটিভ, যা দ্রুত গ্লুকোজ বাড়িয়ে দেয় এবং শিশুদের ক্ষেত্রেও হজম সমস্যা, অলসতা ও মানসিক অমনোযোগ তৈরি করতে পারে। স্বাস্থ্যকর বিকল্প হিসেবে ওটস বা রাগির নুডলস বেছে নেওয়া যেতে পারে।
পাউরুটি: জানান কি, পাউরুটিও এক নীরব শত্রু? বিশেষ করে সাদা পাউরুটি, যা ময়দা ও চিনির মিশ্রণে তৈরি হয় এবং সকালে মাখন বা জ্যামের সাথে খাওয়া হলে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে দেয়। এমনকী অনেক ‘বাদামি পাউরুটি’ও কেবল রঙেই বাদামি, পুষ্টিতে নয়। পাউরুটির পরিবর্তে দেশি খাবার যেমন উপমা, পরোটা বা ওটস-চিলা খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। একইভাবে, হালকা মনে হলেও ফুলে সিদ্ধ ভাত বা মুড়ি উচ্চ গ্লাইসেমিক ইনডেক্সযুক্ত। এতে ফাইবার না থাকায় পেট দ্রুত খালি হয়ে যায় এবং বারবার খিদে পায়। যারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, তাঁদের জন্য এটি অত্যন্ত ক্ষতিকারক। বিকল্প হিসেবে ভাজা ছোলা, মাখনা কিংবা ওটসের মিশ্রণ বেছে নিতে পারেন।
আলু: আলুও ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য মারাত্মক বিপদের কারণ। এতে থাকা উচ্চমাত্রার স্টার্চ দ্রুত গ্লুকোজে পরিণত হয়, যা চিনির মাত্রা অনিয়ন্ত্রিত করে তোলে। আলুর বদলে লাউ, কুমড়ো জাতীয় সবজি শরীরের জন্য অনেক বেশি উপকারী এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, চিনি এই তালিকার অন্যতম বিপজ্জনক উপাদান। প্রতিদিন চা-কফি, মিষ্টি বা প্যাকেটজাত খাবারের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করা চিনি অগ্ন্যাশয়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, ইনসুলিন প্রতিক্রিয়া দুর্বল করে এবং ডায়াবেটিসকে বাড়িয়ে তোলে। এর বদলে খেজুর গুড়, স্টেভিয়া বা ফলের প্রাকৃতিক মিষ্টতা গ্রহণ করা শ্রেয়।
চিকিৎসকদের মতে, এই খাবারগুলি প্রতিদিন খেলে শরীরের স্বাভাবিক বিপাক প্রক্রিয়া ধ্বংস হতে শুরু করে এবং ডায়াবেটিস একবার বেড়ে গেলে তা নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই এখনই খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনা জরুরি। কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্সযুক্ত খাবার, ফাইবার সমৃদ্ধ খাদ্য এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার থেকে দূরে থাকা, সুস্থ জীবনের মূলমন্ত্র। মনে রাখবেন, আপনার খাবারই হতে পারে আপনার বিপদের কারণ।
