পরিতোষ সাহা : বীরভূম
বীরভূম জেলা তৃণমূলের সভাপতির পদ হারালেন অনুব্রত।তৃণমূলের রাজ্য কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাধের কেষ্ট, আর এবার থেকে শুধুই সাত সদস্যের কোর কমিটির সদস্য মাত্র।
২০১১ সালে রাজ্যে তৃণমূল ক্ষমতা আসার আগে থেকেই বীরভূম জেলা তৃণমূল কংগ্রেসের সভাপতির পদ সামলেছেন অনুব্রত।২০০১ সালের ২৭ জুলাই নানুরের সুচপুর গণহত্যার সময়,এই অনুব্রত-ই, তৃণমূলের সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে থেকে বামেদের সাথে লড়াই করেছিলেন।প্রায় তখন থেকেই অনুব্রত জেলার সভাপতির পদ সামলেছেন।তারই হাত ধরে বীরভূমে তৃণমূল সংগঠন মজবুত করেছে।২০১১ সালেবরাজ্যে পালাবদলের পর অনুব্রত মন্ডলের চোখ দিয়ে গোটা জেলা দেখতেন দলনেত্রী।রাজ্যের বিধানসভা,লোকসভা,পৌরসভা ও পঞ্চায়েত নির্বাচনে নিরঙ্কুশ ভাবে দখল করেছিল সমস্ত আসন।জেলায় ১১ টি বিধানসভা,২ টি লোকসভা,৬ টি পৌরসভা ও ১৬৭ টি গ্রামপঞ্চায়েত আসনে লাগাতার ভাবে তৃণমূল দখল করে এসেছে।তা সবকিছুই অনুব্রত-র বদানত্যায়।তার জন্য,দলনেত্রী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারে বারে অনুব্রত-র উপর ভরসা রেখেছিলেন।নির্বাচন আসতেই,বিরোধীদের উদ্দ্যেশ্যে বিভিন্ন রকম শব্দবন্ধ ব্যবহার করতেন। ‘ চড়াম-চড়াম’,‘গুড়বাতাসা’,‘শুঁটিয়ে লাল করে দেব’।এছাড়াও পুলিশকে লক্ষ্য করে বোম মারার কথাও বলেছিলেন অনুব্রত।আর তা নিয়ে গোটা রাজ্যে রাজনৈতিক চাপান উতোর চলেছিল।কিন্তু দলনেত্রী তা দেখেননি।দলনেত্রী বলেছিলেন,‘কেষ্ট অসুস্থ।ওর মাথাতে অক্সিজেন যায় না’।কিন্তু সেই অনুব্রত আর জেলা সভাপতি রইলেন না।
গরু পাচার মামলায় অনুব্রত মন্ডল সিবিআই-এর হাতে গ্রেফতার হবার পর,২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে বোলপুরের রাঙাবিতানে দলীয় নেতাদের নিয়ে দীর্ঘ আলোচনায় বসেছিলেন।সেই আলোচনা চলাকালীন কাজল শেখ কে ডেকে নেন দলনেত্রী।গঠন করা হয় কোর কমিটি।প্রথমে ন’জনের কোর কমিটি গঠন করে দেন দলনেত্রী।সেই কমিটির আহ্বায়ক করা হয় বিকাশ রায় চৌধুরীকে।আর এই কোর কমিটির নেতৃত্বেই ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত ও ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের বৈতরণী পার করে তৃণমূল। দুটি নির্বাচনেই ভালো ফলাফল করে দল।দলনেত্রী সেই কমিটি আর ভাঙেননি।২০২৪ সালে পুজোর আগে অনুব্রত মন্ডল তিহার বাস কাটিয়ে জেলায় ফিরলে, তিনি সভাপতির দায়িত্ব সামলান।তবে,কোর কমিটির সাথে আলোচনা করেই দল পরিচালনার কথা বলে দেন দলনেত্রী।কিন্তু বাস্তবে অনুব্রত মন্ডলের ছায়াসঙ্গী ও কোর কমিটির আহ্বায়ক বিকাশ রায় চৌধুরী সেই বৈঠক ডাকতেন না।অনুব্রত মন্ডল জেলা কমিটির বৈঠক ডেকে সমস্ত সিদ্ধান্ত নিতেন।তাই নিয়ে অনুব্রত ও কাজলের মধ্যে ঠান্ডা লড়াই লেগেই থাকতো।বারে বারে কোর কমিটির বৈঠক ডাকা হচ্ছে না বলে রাজ্য নেতৃত্বের কাছে অভিযোগ করেছিলেন।
সামনেই বিধানসভা নির্বাচন।সেই নির্বাচনের আগে,বীরভূম তৃণমূল আড়াআড়ি ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছিল বলে রাজনৈতিক মহলের বক্তব্য।তাই অনুব্রত মন্ডলের একরোখা মনোভাবের জেরে গোষ্ঠী কোন্দল শুরু হয়েছিল জেলার অন্দরে।নীচু তলার কর্মীরা বুঝেই উঠতে পারছিলেন না কী করবেন।তাই জেলায় তৃণমূলের সংগঠন কিছুটা নড়বড়ে হয়ে গিয়েছিল বলেই অনেকেই স্বীকার করেছিলেন।
তাই,বিধানসভা নির্বাচনের আগেই এই চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিল রাজ্য তৃণমূল। অনুব্রত মন্ডল কে জেলা সভাপতির পদ থেকে সরিয়ে দিল।কারণ,সামনেই বিধানসভা নির্বাচন।অনুব্রত-র পালটা নেতা কাজল শেখ অনেকটাই পরিণত।রাজ্য নেতৃত্ব বুঝে গেছে অনুব্রত-র বিকল্প নেতা বীরভূমে আছে।তাই, কয়েক দশকের সভাপতির পদ খোয়ালেন অনুব্রত।যদিও অনুব্রত পন্থী তৃণমূল নেতারা কেউই তেমন ভাবে মুখ খুলছেন না। যদিও অনুব্রত বিরোধী ও বীরভূম জেলা পরিষদের সভাধিপতি কাজল শেখ বলেন,‘এটাই প্রত্যাশিত ছিল।দলনেত্রী যে কোর কমিটির উপর ভরসা রেখেছেন,তাকে ধন্যবাদ’।
তবে,অনেকেই মনে করছেন,এবার অনুব্রত-র রাজনৈতিক জীবন ও ক্যারিয়ার প্রায় শেষ।এখন দেখার সামনের বিধানসভা নির্বাচনের লড়াই কে সামনে রেখে বীরভূম তৃণমূলের আভ্যন্তরীণ লড়াই কোন দিকে গড়ায়।
