
রাজা বন্দ্যোপাধ্যায়
বিহার বিধানসভা নির্বাচনের প্রহর গোনা শুরু হয়েছে। ভোটের আগে রাজ্যের রাজনৈতিক মঞ্চে এখন আলোচনার কেন্দ্রে তিনটি মুখ, নীতীশ কুমার, তেজস্বী যাদব ও প্রশান্ত কিশোর। তাঁদের সাফল্য বা ব্যর্থতা শুধু নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নয়, বরং রাজ্যের ক্ষমতার সমীকরণও নির্ধারণ করতে পারে।
নীতীশ কুমার: ‘সুশাসন বাবু’র পুনরাবৃত্তি না পরিসমাপ্তি?
৭৪ বছর বয়সী নীতীশ কুমার জনতা দল (ইউনাইটেড)-এর সর্বাধিনায়ক এবং দুই দশক ধরে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী। এক সময় তিনি ‘সুশাসন বাবু’ নামে পরিচিত ছিলেন, প্রশাসনিক সংস্কার ও উন্নয়নমূলক উদ্যোগের জন্য প্রশংসিত হন। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় নীতীশ কুমার বেশি আলোচনায় এসেছেন তাঁর রাজনৈতিক দোদুল্যমানতা ও জোট বদলের জন্য।
সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর কিছু ভিডিয়ো ভাইরাল হওয়ায় শারীরিক সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিরোধীরা বলছে, বয়স ও স্বাস্থ্য দুটোই এখন তাঁর বিরুদ্ধে কাজ করছে। তবুও বিজেপি এখনও পর্যন্ত নীতীশের বিকল্প মুখ হিসেবে কাউকে তুলে ধরেনি। অর্থাৎ, জেডিইউ-বিজেপি জোটের মুখ হিসেবে নীতীশ কুমারই নেতৃত্ব দিচ্ছেন নির্বাচনে।
এখন বড় প্রশ্ন হল, এই নির্বাচন কি নীতীশ কুমারকে দশমবারের মতো মুখ্যমন্ত্রীর শপথ নিতে দেখবে, নাকি এটি হবে তাঁর যুগের সমাপ্তির সূচনা?
তেজস্বী যাদব: যুব নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জ
৩৫ বছর বয়সী তেজস্বী যাদব আরজেডি প্রতিষ্ঠাতা ও প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী লালুপ্রসাদ যাদবের পুত্র। তিনি এই নির্বাচনে সবচেয়ে কঠিন লড়াইয়ের মুখোমুখি। ২০২০ সালের নির্বাচনে আরজেডি ১৪৪টি আসনে লড়েছিল এবং ৭৫টি আসন জিতে একক বৃহত্তম দল হিসেবে উঠে এসেছিল। কিন্তু কংগ্রেসের দুর্বল পারফরম্যান্সের কারণে সরকার গঠনের সুযোগ হারায় জোট।
এরপর থেকে অসুস্থ লালু যাদবের অনুপস্থিতিতে তেজস্বী একাই দলের হাল ধরেছেন। গত বছরের লোকসভা নির্বাচনে আশানুরূপ ফল না পেয়ে এবার তিনি রাজ্যের ভোটে সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়েছেন।
তিনি রাহুল গান্ধীর ‘ভোটার অধিকার যাত্রা’তে অংশ নিয়েছেন এবং নিজে ‘বিহার অধিকার যাত্রা’ শুরু করেছেন ভোটের আগে রাজ্যজুড়ে জনসংযোগ গড়ে তুলতে।
কিন্তু তাঁর সামনে এখন বিজেপির শক্তিশালী নির্বাচনী যন্ত্র, যা তাঁকে এক কঠিন বাস্তব পরীক্ষায় ফেলেছে। এবার তেজস্বীকে শুধু ভাল ফল নয়, অসাধারণ ফলাফল আনতে হবে, যদি সত্যিই তিনি সরকার গঠনের দৌড়ে থাকতে চান।
প্রশান্ত কিশোর: কৌশলবিদ থেকে রাজনীতিকের রূপান্তর
প্রাক্তন নির্বাচনী কৌশলবিদ প্রশান্ত কিশোর এখন নিজের গড়া রাজনৈতিক দল ‘জন সুরজ পার্টি’-কে সামনে রেখে রাজনীতিতে নতুন ইনিংস শুরু করেছেন। ২০২২ সালে তিনি রাজ্যজুড়ে যাত্রা করেন এবং দাবি করছেন, সাধারণ মানুষের মধ্যে তাঁর প্রতি যথেষ্ট সমর্থন তৈরি হয়েছে, যা ভোটে প্রতিফলিত হবে। এই নির্বাচনে সরকার গড়ার চাবিকাঠি তাঁর হাতে থাকবে বলেই দাবি কিশোরের।
মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো অবশ্য এই দাবি উড়িয়ে দিয়েছে। তাঁদের মতে, জন সুরজের অভিষেক হবে “একটি ব্যর্থ প্রচেষ্টা”। অনেকে প্রশান্ত কিশোরকে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, তিনি কেবল বিতর্ক তৈরি করে রাজনীতিতে জায়গা খুঁজছেন।
তবে প্রশান্ত কিশোরের সোশ্যাল মিডিয়া প্রচার এবং তরুণদের মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা তাঁর দলকে আলোচনায় রেখেছে। ভোটের ফলই বলে দেবে ‘জন সুরজ’-এর এই আলো কতটা বাস্তব, আর কতটা শুধুই প্রচারের ঝলক।
বিহারের এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদলের নয়, বরং রাজ্যের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্ধারণের লড়াই। নীতীশ কুমারের সামনে আত্মপ্রমাণের সুযোগ, তেজস্বীর সামনে নিজ প্রজন্মের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জ, আর প্রশান্ত কিশোরের সামনে রাজনীতিতে নিজের জায়গা তৈরি করার সংগ্রাম।
বিহারের মানুষ এবার সিদ্ধান্ত নেবে কার হাতে থাকবে আগামী পাঁচ বছরের রাজ্য শাসনের দায়িত্ব, এবং ইতিহাসের পাতায় কার নাম লেখা থাকবে নতুন অধ্যায়ের সূচনায়।

