নয়াদিল্লি: অযোধ্যার রামমন্দিরে ভক্তদের দেওয়া অনুদান ঘিরে বিতর্ক দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে। প্রথমে অভিযোগ ছিল দানবাক্সের কোটি কোটি টাকা ও মূল্যবান সামগ্রী আত্মসাতের। কিন্তু বিশেষ তদন্তকারী দল (এসআইটি)-র তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে অভিযুক্তদের বিপুল সম্পত্তির হদিস। মাত্র ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা মাসিক বেতনের কর্মচারীদের নামে কোটি টাকার জমি, বিলাসবহুল বাড়ি এবং অস্বাভাবিক সম্পত্তি বৃদ্ধির অভিযোগ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে অনুদান ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিয়ে।
গত ৭ জুন সমাজবাদী পার্টির প্রাক্তন বিধায়ক পবন পাণ্ডে অভিযোগ করেন, রামমন্দিরে ভক্তদের দেওয়া প্রায় সাড়ে সাত কোটি টাকার অনুদান আত্মসাৎ হয়েছে। বিতর্ক বাড়তেই মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের নির্দেশে তিন সদস্যের এসআইটি গঠন করা হয়। তদন্তে আর্থিক নথি, অনুদান গণনার প্রক্রিয়া, দানবাক্সের হিসাব এবং ট্রাস্ট-সংক্রান্ত বিভিন্ন নথি খতিয়ে দেখা শুরু হয়।
তদন্ত চলাকালীন অযোধ্যার এক কর্মচারী লবকুশ মিশ্রের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে নগদ ১০ থেকে ১২ লক্ষ টাকা উদ্ধার করে পুলিশ। তদন্তকারীদের দাবি, অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই তাঁর সম্পত্তির পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। স্থানীয়দের বক্তব্য, একসময় গাড়ি মেরামতির কাজ করা ওই ব্যক্তি মন্দিরে চাকরি পাওয়ার পর দ্রুত আর্থিকভাবে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠেন। পরে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।
শুধু লবকুশই নন, অনুদান গণনার দায়িত্বে থাকা আরও দুই কর্মচারীর সম্পত্তি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তদন্তকারীদের দাবি, মাসে ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা বেতন পাওয়া দুই কর্মীর একজন সম্প্রতি প্রায় দেড় কোটি টাকার জমি এবং অন্যজন প্রায় ৪০ লক্ষ টাকার জমি কিনেছেন। তাঁদের আয়ের সঙ্গে এই সম্পত্তির সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এসআইটির প্রাথমিক রিপোর্টে ১৭ জনের বিরুদ্ধে অনিয়মের ইঙ্গিত মিলেছে বলে জানা গিয়েছে। পাশাপাশি মন্দিরের সঙ্গে যুক্ত প্রায় দেড়শো সেবাদারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তদন্তে অনুদানের টাকা জমা, হিসাবরক্ষণ, সোনা-রুপোর অলঙ্কার সংরক্ষণ এবং ট্রাস্টের আর্থিক লেনদেনের একাধিক দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে এসআইটির প্রাথমিক রিপোর্ট জমা পড়ার পর উত্তরপ্রদেশ পুলিশ ইতিমধ্যেই আট জনের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করেছে এবং তাঁদের গ্রেফতারও করা হয়েছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে চুরি, প্রতারণা, অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ এবং ষড়যন্ত্র-সহ একাধিক ধারায় মামলা রুজু হয়েছে।
এই ঘটনায় রাজনৈতিক চাপানউতোরও তীব্র হয়েছে। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) দ্রুত বিচার এবং দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবি তুলেছে। অন্যদিকে বিরোধীদের অভিযোগ, অনুদান কেলেঙ্কারিতে প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশ থাকতে পারে। যদিও উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ স্পষ্ট জানিয়েছেন, তদন্তে যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তাঁদের কাউকেই রেহাই দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে তিনি অযোধ্যা ও রামমন্দির সম্পর্কে ভিত্তিহীন মন্তব্য না করার আবেদন জানিয়েছেন।
রামমন্দিরে প্রতিদিন হাজার হাজার ভক্তের দেওয়া অনুদান এবং তার ব্যবস্থাপনা নিয়ে তৈরি হওয়া এই বিতর্ক এখন শুধু একটি আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে সীমাবদ্ধ নেই। তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে নতুন তথ্য। কোটি টাকার সম্পত্তির উৎস, অনুদানের প্রকৃত হিসাব এবং ট্রাস্টের প্রশাসনিক ভূমিকা- সবকিছু নিয়েই এখন নজর তদন্তকারী সংস্থার। শেষ পর্যন্ত এই তদন্ত কোথায় গিয়ে পৌঁছায়, তার দিকেই তাকিয়ে দেশজুড়ে রাজনৈতিক মহল এবং রামভক্তরা।
রামমন্দিরের অনুদান-কাণ্ডে তদন্তে বেরোচ্ছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য